রংপুর: পশু আছে, দাম আছে, কিন্তু নেই আস্থার বাজার। দালাল ও ইজারাদারদের হয়রানি, বৈরী আবহাওয়া এবং পরিবহণ খরচের ঊর্ধ্বগতি—তিন সংকটেই রংপুর বিভাগে ক্রেতা-বিক্রেতাকে হাট থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। খামারমুখী কেনাকাটা বেড়েছে, কিন্তু সেখানেও সরকারি রাজস্ব আদায়ের সুযোগ কমছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের কোরবানির এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হাট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রংপুর বিভাগে চাহিদার চেয়ে সাড়ে ৫ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকলেও হাটে জমছে না কেনাবেচা; দালাল ও ইজারাদারদের হয়রানি ও বৈরী আবহাওয়ায় ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় পক্ষই হাটবিমুখ। অন্যদিকে বাড়ছে খামারকেন্দ্রিক কেনাকাটা। ঈদকে ঘিরে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে লেনদেন হতে পারে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদুল আযহা। হাতেগোনা আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। রংপুর বিভাগের পশুর হাটগুলোতে গরু-ছাগলের অভাব নেই—বরং উদ্বৃত্ত রয়েছে সাড়ে ৫ লাখের বেশি পশু। তবে ক্রেতার উপস্থিতি ও বিক্রি দুটোই আশানুরূপ নয়। বৈরী আবহাওয়া, দালাল ও ইজারাদারদের হয়রানি, এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি—তিনটি কারণেই এবারের কোরবানির বাজার কিছুটা থমথমে।
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য বলছে, রংপুর বিভাগের আট জেলায় এ বছর কোরবানির চাহিদা ১৪ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭টির বিপরীতে প্রস্তুত রয়েছে ২০ লাখ ২৩ হাজার ৬৭টি পশু। অর্থাৎ উদ্বৃত্ত ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৪১০টি। এসব পশু ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। পশু বিক্রির মাধ্যমে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে যোগ হবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু হাটে হাটে ঘুরে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।
হাটভর্তি পশু, কেনাবেচায় ভাটা
রংপুর জেলার অন্যতম বৃহৎ পশুর হাট তিস্তা নদীবেষ্টিত গঙ্গাচড়ার বেতগাড়ি হাট। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এই হাট বসে। গত মঙ্গলবার সেখানে গরু উঠেছিল প্রায় ৫ হাজার। কিন্তু বিক্রি হয়েছে মাত্র ৭০০টি—যেখানে ছোট গরু ৬০-৭০ হাজার, মাঝারি ৮০-৯০ হাজার ও বড় এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
হাট ঘুরে দেখা যায়, দেশি, শংকর ও বিদেশি জাতের গরু রয়েছে সারি সারি। দাম হাঁকা হচ্ছে সর্বনিম্ন ৬০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬ লাখ টাকা। ছাগল ১০ হাজার থেকে ৩৪ হাজার টাকায়। কিন্তু ক্রেতা বলছেন, দাম বেশি। বিক্রেতা বলছেন, খরচ বাড়লেও দাম কম।
নীলফামারীর ডিমলা থেকে আসা বিক্রেতা আব্দুল লতিফ সারাবাংলাকে জানান, ‘গত বছর যেভাবে বিক্রি হয়েছে, এবার সে তুলনায় অনেক কম। হাটে প্রচুর গরু, ক্রেতাও আছে, কিন্তু বিক্রি নেই।’ তাই তিনি লাইভ ওয়েটে কেজিপ্রতি ৪৮০ টাকা দরে গরু বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অথচ গতবছর কেজি ৫২০-৫৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল।
যে তিন কারণে হাটবিমুখ ক্রেতা-বিক্রেতা
প্রথমত, বৈরী আবহাওয়া ও গত কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে হাটের মাঠ কর্দমাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে পশু ও মানুষের চলাচল অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। ক্রেতারা দূর থেকে আসতে চান না। দ্বিতীয়ত দালাল ও ইজারাদারদের হয়রানি এনেছে বড় বিপদ। ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষের কাছ থেকেই একই সুর—হাট ইজারাদারের লোকজন ও দালালরা নানাভাবে টাকা আদায় করছেন। বেতগাড়ি হাটে আসা এনজিওকর্মী সালাম হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বহু কষ্টে উপার্জিত টাকা দিয়ে গরু কিনতে এসেছি। কিন্তু, দালালকে ডিঙিয়ে হাটে গরু কেনার সুযোগ নেই। নিজেরা দরদাম করলেও নানা কায়দায় দালালরা টাকা আদায় করেন।’
পালিচড়া হাট ইজারাদার রেজাউল করিম অবশ্য দাবি করেন, ‘হাসিল বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই, সবকিছু রশিদে উল্লেখ থাকে।’ সেখানে গরু লেখা ৭০০ ও চাঁদা ২০০ টাকা, ছাগলের জন্য ২৫০ টাকা লেখা ও চাঁদা ১০০ টাকা।
তৃতীয়ত, পাইকারি ক্রেতার অনুপস্থিতি। ঢাকা থেকে আসা পাইকার নিজাম উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘অন্যবার ঈদের ১৫-২০ দিন আগে ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে পাইকাররা এসে রংপুরের হাট থেকে গরু কিনে নিয়ে যেত। এবার সেই সংখ্যা একেবারেই কম। কারণ হাসিলের নামে জোর করে বেশি টাকা আদায়, দালালদের উৎপাত ও পরিবহণ খরচ আগের চেয়ে অনেক বেশি।’
খামারমুখী ক্রেতা বাড়ছে, হাট ফাঁকা হচ্ছে
এবার ক্রেতার একটি বড় অংশই হাটের পরিবর্তে সরাসরি খামারে গিয়ে পশু বুকিং দিয়েছেন। রংপুরের মাহিগঞ্জের জমজম ক্যাটল ফার্মের কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিদিন ক্রেতারা এসে ওজন স্কেলে গরু মেপে দাম নির্ধারণ করছেন এবং ঈদের আগে বুকিং দিয়ে যাচ্ছেন।
ক্রেতাদের মতে, ওজন দরে গরু কেনাবেচায় প্রতারণার আশঙ্কা কম থাকে। তবে খামারকেন্দ্রিক বিক্রি বাড়ায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছেন বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি
নগরীর লালবাগ, বুড়িরহাটসহ বেশ কয়েকটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, ছোট সাইজের গরু (৭০-৯০ হাজার টাকা) ও মাঝারি সাইজের গরু (১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮ হাজার টাকা) বিক্রি হচ্ছে বেশি। বড় সাইজের গরু (আড়াই লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা) বিক্রি কম। বড় গরুর চাহিদা খুবই কম।
নগরীর শাপলা চত্বর এলাকার আব্দুল হাই প্রধান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঈদের আরও কিছু সময় আছে, হাটগুলো ঘুরে দাম যাচাই করছি।’ আব্দুর নূর এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এবার গরুর দাম একটু বেশি মনে হচ্ছে। ঈদের দুই-তিন দিন আগে দাম কিছুটা কমতে পারে।’
লালবাগ হাটে জমজমাট কেনাবেচা, তবু স্বস্তি নেই
রংপুর নগরীর সবচেয়ে বড় গরুর হাট লালবাগে রোববার থেকে জমে উঠেছে কেনাবেচা। সেখানে ছোট সাইজের গরু ৭০-৮০ হাজার, মাঝারি দেড়-দুই লাখ, বড় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু হাট ইজারার দায়িত্বে থাকা আব্দুল্লাহেল কাফি সারাবাংলাকে জানান, গরুর আমদানি একেবারেই কম। সাধারণ মানুষের হাতে টাকা নেই।
খামারিদের আশঙ্কা ও সরকারের হিসাব
রংপুর ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি লতিফুর রহমান মিলন সারাবাংলাকে বলেন, ‘পশুখাদ্য, খড়, ভুসি, খৈল ও ওষুধের দাম বাড়ায় এবার মাংস কেজি ৭০০-৭৫০ টাকার নিচে বিক্রি করলে খামারিদের লোকসান হবে। সীমান্তে কড়াকড়ি থাকলেও ভারতীয় গরু এলে ক্ষতি হবে।’
তবে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল হাই সরকার আশাবাদী। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত সাড়ে ৫ লাখ পশু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাবে। এতে লেনদেন হবে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।’
তিনি বলেন, ‘হাটে অসুস্থ বা ক্ষতিকর ওষুধ প্রয়োগ করা পশু যাতে বিক্রি না হয়, সেজন্য প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভেটেরিনারি টিম কাজ করছে। জাল টাকা শনাক্তে মেশিন, পুলিশ টহল ও স্বেচ্ছাসেবক দল রয়েছে।’ তবে দালাল ও ইজারাদারদের হয়রানির অভিযোগ থামছে না।
সারাদেশের প্রেক্ষাপটে রংপুরের অবস্থান
রংপুর বিভাগে মোট ১ হাজার ৩০৩টি স্থায়ী হাট রয়েছে। এবারে জেলাভিত্তিক কোরবানির পশুর হিসাব রংপুরে প্রস্তুত পশু ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯১, চাহিদা ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৯, গাইবান্ধায় পশু ১ লাখ ৭৭ হাজার ৯০০, চাহিদা ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০, কুড়িগ্রামে পশু ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯১৯, চাহিদা ২ লাখ ৬১ হাজার ২৪৬, নীলফামারীতে পশু ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৫০, চাহিদা ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৭৬, লালমনিরহাটে পশু ২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২, চাহিদা ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৮৪, দিনাজপুরে পশু ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫২৩, চাহিদা ২ লাখ ৭৩ হাজার ২৬২, ঠাকুরগাঁওয়ে পশু ৯৫ হাজার ৪৩৬, চাহিদা ৭৮ হাজার ৮৪৩ এবং পঞ্চগড়ে পশু ১ লাখ ৩০ হাজার ৩০৩, চাহিদা ১ লাখ ৩ হাজার ৬৫০টি।
সূত্র জানায়, এবার সাড়ে আট লাখের মতো গরু প্রস্তুত করেছেন আড়াই লাখ খামারি। আর দুই লাখের বেশি গৃহস্থ বাজারে প্রায় ১০ লাখ গরু-ছাগল বিক্রির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন।