ঢাকা: শনিবার সকাল ১০টা। কারওয়ান বাজার থেকে পান্থপথ সিগন্যাল। ফুটপাতে নেই কোনো দোকানপাট। সব সরিয়ে নিয়েছে ব্যবসায়ীরা। যে দুয়েকটি চৌকি ছিল সেগুলোও পুলিশের গাড়িতে তুলে নেওয়া হচ্ছে। মেট্টোরেলের ওভারব্রিজ থেকে পশ্চিম দিকে তাকালে মনে হচ্ছিল যেন ইউরোপের সড়ক। কিন্তু মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানেই আগের দৃশ্যপট ও চিরচেনা রূপে ফিরল পান্থপথমুখী সড়কটি। ফের বসে গেল ভ্রাম্যমাণ দোকান, আবার স্থায়ী দোকানের পণ্যও হাজির ফুটপাতে। মানুষের চলাচলের ফুটপাত ফের হকারদের দখলে।
এর আগে শনিবার (৪ মার্চ) সকাল ১০টায় অভিযান শুরু করে ডিএমপির ট্রাফিক রমনা বিভাগ। এতে নেতৃত্ব দেন ট্রাফিক রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার রুমানা নাসরিন। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ছিলেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসেন। তারা কারওয়ান বাজার সার্ক ফোয়ারা থেকে সড়কের দুই পাশ দিয়ে অভিযান পরিচালনা করতে করতে পান্থপথ সিগন্যাল পর্যন্ত এগিয়ে যান। বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে এই অভিযান শেষ হয় দুপুর ১টায়।
এর পর পান্থপথ সিগন্যাল ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সামনে জড়ো হয়ে কলা-রুটি আর পানি খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন অভিযানে থাকা পুলিশ সদস্যরা। আর এই সুযোগে মুহূর্তের মধ্যেই ফের ফুটপাত দখলে নেয় হকার ও ব্যবসায়ীরা। কেউ পানের ডালা, কেউ সিংগাড়া-পিঁয়াজু নিয়ে, আবার কেউ ভাতের হোটেল নিয়ে। তবে জুতা ও অন্যান্য জিনিসপত্র বিক্রেতারা এ সময় না বসলেও চৌকি বসিয়ে আগের জায়গা পুনরায় দখলে নেয়।
ভাতের হোটেল ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘দুপুর টাইম এখন বেচাকেনা না করলে কখন করব। তাই রিস্ক নিয়ে বসছি। কাস্টমারের পেটে ক্ষুধা, তাই খোলা অবস্থাতেই খাওয়া-দাওয়া করছে। পুলিশ এলে আবার চলে যেতে হবে।’ তবে আজ আর আসবে না বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।
সিংগাড়া বিক্রেতা আবুল কালাম আজাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘অভিযানের সময় সরে গিয়েছিলাম। এখন আসছি। কারণ, অভিযান আজকের মতো শেষ। আমাদের তো বাঁচতে হবে। ১৫ বছর ধরে এই ফুটপাতে ব্যবসা করি। বউ-বাচ্চা আছে, লেখাপড়ার খরচ আছে। সবই দেখতে হয়। সরকার অভিযান চালালে তো কিছু বলতে পারি না। যা ভালো মনে করছে তাই করছে।’
তবে চায়ের দোকানদার রবিউল হাসান খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন বলে দিয়েছে, অভিযানের আগে ফোনে জানিয়ে দেওয়া হবে। সবাই যেন মালামাল সরিয়ে নেয়। করপোরেশনের গাড়ি যা পাবে তাই উঠিয়ে নিয়ে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযানের আগে সরিয়ে নেব। কিছুক্ষণ পর আবার বসাব। পুলিশ হোক, আর সিটি করপোরেশন হোক, আমরা অভিযানের আগে সিগন্যাল পাব। সংসার চালাতে আমাদের কৌশল করেই চলতে হবে। তবে এবার আমরা জনসাধারণের চলাচলের জায়গা ছেড়ে বসতে চাই।’
জুতা বিক্রেতা রুবেল হাসান সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমরা এমননিতেই দুপুরের দিকে বসি, আর রাত ৯টার মধ্যেই বন্ধ করে দিই। এখানে একটি মার্কেট গড়ে উঠেছে, অনেক ক্রেতা আসে। সারাদেশের অনেকেই জেনে গেছে যে, এখানে অল্প দামে ভালো মানের বিদেশি জুতা পাওয়া যায়। আজ আমরা দোকান বসানোর আগেই অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। অনেকের চৌকি নিয়ে গেছে। এখন কৌশল করে চলতে হবে। অভিযান যেদিন হবে সেদিন আমরা আর বসব না। তবে আজ আবারও বসছি। কারণ, অভিযান শেষ।’
বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ইমরান আহমেদ অভিযানের সময় সারাবাংলাকে বলেন, ‘আজ দোকানপাট নেই, কত সুন্দরভাবে হাঁটা-চলা করা যাচ্ছে। সড়কও ফাঁকা। হেঁটেই যাওয়া যাচ্ছে। অথচ, অন্যদিন হাঁটাই যেত না। এরকম ফাঁকা থাকলে তো ভালোই হতো। কিন্তু কত ঘণ্টা থাকবে সেটাই দেখার বিষয়।’
এদিকে দুপুর ১টার দিকে আরেক পথচারী নওশাদ হোসেনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ চলে গেছে। একটু পরেই দেখবেন সেই আগের মতো সবাই দোকান বসিয়েছে। তখন হাঁটার জায়গাটুকুও থাকবে না। এটি বন্ধ করতে হলে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে এবং তদারকি করতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আজ প্রথম অভিযান চালানো হয়েছে। সেইসঙ্গে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। ফুটপাতের পাশে থাকা দোকানদারদের বলা হয়েছে, সামনের ফুটপাতে যাতে কেউ বসতে না পারে। এরপর কেউ বসলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিযান নিয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির ট্রাফিক রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার রুমানা নাসরিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা দু’দিন আগে নোটিশ দিয়েছি তাদের মালামাল সরিয়ে নিতে। আজ আমরা অভিযান চালিয়েছি। তাতে অনেকে সরিয়ে নিয়েছে, অনেকে নেয়নি। যারা নেয়নি তাদের মালামাল আমরা ট্রাকে করে নিয়ে এসেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর পর তদারকি হবে। নতুন করে বসলে আমরা ফের অভিযান চালাব। তখন শুধু অভিযান নয়, বরং শাস্তি হিসেবে জেল-জরিমানাও হতে পারে। জনগণের ফুটপাত ছেড়ে দিতে হবে- এটাই শেষ কথা।’