চট্টগ্রাম ব্যুরো: শ্রমিকদলের ডাকা ধর্মঘটে দুইদিনের অচলাবস্থার পর এ আন্দোলনের পেছনে বিশেষ মহলের ইন্ধন আছে কি-না সেদিকে খেয়াল রাখার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন মুখপাত্র।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘কিছুই করার নেই’ জানিয়ে তিনি বলেছেন, সরকার চুক্তি করলে বন্দর কর্তৃপক্ষ সেটা বাস্তবায়নে বাধ্য।
শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে দ্বিতীয় দিনের অচলাবস্থার মধ্যে রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক সাংবাদিকদের এসব কথা বলেছেন।
কর্মবিরতির মধ্যেও বন্দরে অপারেশনাল কার্যক্রম চলছে উল্লেখ করে ওমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের বন্দরে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) প্রায় এক হাজার টিইইউস কনটেইনার ডেলিভারি গেছে। আজকেও প্রায় ১৭০০ টিইইউসের মতো ডেলিভারি যাবে, অ্যাসাইনমেন্ট আছে। কার্যক্রম চলমান আছে। ভেতরে সবগুলো জাহাজের কার্যক্রম চলমান আছে। ইয়ার্ডের কার্যক্রমও চলমান আছে।’
‘ডেলিভারির গাড়ি সকালের দিকে স্বাভাবিকভাবেই একটু কম প্রবেশ করে। বিকেল থেকে ডেলিভারি কার্যক্রম চলবে এবং যারা যারা ডেলিভারি নিতে আগ্রহী কিংবা ইউজার যারা আছেন, তাদের আহ্বান জানাবো যে, তারা যেন তাদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে। আমাদের চট্টগ্রাম পোর্টে যারা আছেন, তারা সাতদিন ২৪ ঘণ্টা এখানে কাজ করে। সব জায়গায় আমাদের লোকজন আছে।’
‘কেউ যদি বাইরে অপপ্রচার করে যে লোক নেই, কাজ নেই, ভেতরে যাবেন না, এগুলোতে কান না দেওয়ার জন্য আমরা অনুরোধ জানাব।’
কর্মবিরতি খুব একটা প্রভাব ফেলছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত তারা যে কর্মসূচি দিয়েছে, সেটা আমরা ম্যানেজ করে যাচ্ছি। আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছে। শনিবার রাত অব্দি কাজ হয়েছে, ডেলিভারিও গেছে। আজকেও কাজ হবে। এক্ষেত্রে আমার মনে হয় না কর্মবিরতি খুব একটা প্রভাব ফেলছে। বন্দরের যেসকল ক্ষতি অভ্যন্তরে হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে ডেলিভারি না দেওয়ার কারণে বা ডেলিভারি কম দেওয়ার কারণে, সেই বিষয়গুলো দেখার জন্য এবং ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণের জন্য আমরা একটা কমিটি করেছি। সেই কমিটি ক্ষতির পরিমাণটা নির্ধারণ করবে।’
রমজানের আগে এ ধরনের আন্দোলন ‘সঠিক হচ্ছে না’ মন্তব্য করে পরিচালক ওমর ফারুক বলেন, ‘সামনে রমজান। আমরা এ বিষয়ে খুব কনসার্ন। যারা বহির্নোঙ্গরে জাহাজকে আমদানি পণ্যের ভাসমান গুদাম বানিয়ে রেখেছে, আমরা সেখানে অভিযান চালাচ্ছি। আজকেও অভিযান হয়েছে, এক সপ্তাহ আগেও অভিযান হয়েছে। আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে আরও অভিযান হবে। আমরা চাই রমজানের আগে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকুক। ভোক্তারা যেন কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন, সেটা নিশ্চিত করার চেষ্টা আমর করি।’
‘তবে এসব কিছুকে সামনে রেখে এখানে কোনো বিশেষ মহল আমাদের কর্মচারীদের কোনো ইন্ধন দিচ্ছে কি-না, কোনো অবৈধ সুবিধা নেওয়ার পাঁয়তারা কেউ করছে কি-না, সেটা আমাদের একটু খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, আমরা চাই বন্দর সার্বক্ষণিকভাবে খোলা থাকুক। ভোক্তারা সঠিকরকম সেবা পাক এবং দ্রব্যমূল্য যেন স্থিতিশীল থাকে বিশেষ করে রমজানের আগে। এ বিষয়টা একটু সবাইকে বিবেচনায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।’
চুক্তির আগেই আন্দোলন কেন- এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘চুক্তির বিষয়টা তড়িঘড়ির কোনো বিষয় না। এখানে পিপিপি অথরিটির মাধ্যমে এ কার্যক্রমটা হচ্ছে। পিপিপি গাইডলাইন অনুযায়ী এ কার্যক্রমটা চলমান আছে। এখনো পর্যন্ত চুক্তি হয়েছে, এ রকম কোনো খবর কিন্তু আমরা জানি না। এ ধরনের কিছু হওয়ার আগেই সবাই যে এ ধরনের একটা মুভমেন্টে যাচ্ছে, এটাতে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলছে। আমরা মনে করি এটা সঠিক হচ্ছে না।’
আন্দোলনকারীদের কয়েকজনকে বদলির প্রসঙ্গে ওমর ফারুক বলেন, ‘বদলির বিষয়টি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এটা প্রশাসনিক কারণে এবং কাজের গতিশীলতার কারণে, দাফতরিক কারণে যে কোনোসময় যে কাউকে বদলি করা যায়। এটা সেটারই একটা অংশ। বিষয়টা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এরা জয়েন করেছে কি-না, সেটা যে স্পটে তাদের বদলি করা হয়েছে, সেখানে যিনি চার্জে আছেন, তার কাছ থেকে আমরা একটা রিপোর্ট নেব। তিনি আমাদের জানাবেন। সিদ্ধান্ত অমান্য করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এনসিটি ইজারার চুক্তি প্রসঙ্গে বন্দরের মুখপাত্র বলেন, ‘এটা হচ্ছে একটা সরকারি সিদ্ধান্ত। এটা পিপিপি অথরিটির মাধ্যমে পিপিপি গাইডলাইন অনুযায়ী হচ্ছে। আমরা এখানে হলাম, সরকারি সিদ্ধান্ত পেলে সেটা বাস্তবায়নকারী মাত্র। সুতরাং সরকারি সিদ্ধান্ত যেভাবেই হোক, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সেটা বাস্তবায়ন করবে। চুক্তিটা হলে আপনারা জানবেন।’
এনসিটি আরব-আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী সাবেক সিবিএ ধমর্ঘটের ডাক দেয়। ধর্মঘট মেনে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজে যোগ না দেওয়ায় শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ ছিল। দ্বিতীয় দিনে রোববার তারা অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমও বন্ধের ডাক দিয়েছিল। তবে রোববার প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল থাকলে অপারেশনাল কার্যক্রম আগের দিনের মতো বন্ধ ছিল।
উল্লেখ্য, শনিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে কর্মবিরতি পালন করায় চার কর্মচারীকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করা হয়। বন্দর অচলের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে একটি কমিটি গঠন করেছে বন্দর প্রশাসন।
এ ছাড়া শনিবার মধ্যরাতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সিএমপি কমিশনার বন্দর এলাকায় সভা-সমাবেশ, মিছিল, পথসভাসহ যে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।