Friday 02 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নিষিদ্ধ ঘোষণা ‘কথার কথা’, থার্টি ফার্স্টে নীরব পুলিশ

মেহেদী হাসান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৭

থার্টি ফার্স্ট নাইট। ফাইল ছবি

ঢাকা: থার্টি ফার্স্ট নাইট, অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উপলক্ষ্যে প্রতিবছরই রাজধানীজুড়ে আতশবাজি, পটকা ফোটানো, ফানুস ও গ্যাস বেলুন ওড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। কিন্তু এটা যে ‘কথার কথা’ তা প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর রাত এলেই বোঝা যায়। প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকেই বর্ষবরণের নামে চলতে থাকে ডিজে পার্টি, গান-বাজনা, এলোমেলো বাইক রাইডিং থেকে শুরু করে সবধরনের অপসংস্কৃতি।

রাত বেড়ে ১২টা ছুঁতেই যেন শুরু হয় তাণ্ডবলীলা। বর্ষবরণের নামে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে আতশবাজি ও পটকা ফোটানোর প্রতিযোগিতায় নামে উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা। কিন্তু, এগুলো বন্ধে দেখা যায় না পুলিশের তৎপরতা। তারা একপ্রকার ‘নীরব ভূমিকা’ পালন করে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি এই পরিস্থিতির। নিষেধাজ্ঞার পরও রাজধানীরজুড়ে আতশবাজি ও পটকা ফোটানোর প্রতিযোগিতা চলেছে। আর এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

থার্টি ফার্স্ট নাইটে ফানুস ওড়াতে গিয়ে প্রতিবছরই রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ফানুসের আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেট্রোরেলের লাইন; এমনকি আগুনে দগ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ২০২২ সালে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের রাতে মুহুর্মুহু আতশবাজির শব্দে ভয় পেয়ে অসুস্থ হয়ে এক শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া, আতশবাজি-পটকার শব্দে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

২০২৬ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইটে কিছু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা দিয়ে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ‘সবধরনের আতশবাজি, পটকা ফোটানো, ফানুস ও গ্যাস বেলুন উড়ানো নিষিদ্ধ করা হলো। এছাড়া, উন্মুক্ত স্থানে কোনো ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ডিজে পার্টি, র‍্যালি বা শোভাযাত্রা করা যাবে না।’ কিন্তু নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাজধানীজুড়ে ৩১ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১১টা ৫৫ মিনিট থেকে রাত প্রায় দেড়টা পর্যন্ত মুহুর্মুহু ফোটানো হয় আতশবাজি ও পটকা। এতে শিশুরাও ভয়ে কেঁপে উঠছে জানিয়ে অনেকেই পোস্ট দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। এমনকি, রাজধানীর মিরপুরে ফানুসের আগুন থেকে একটি বহুতল বভনে আগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

গত কয়েকবছর থার্টি ফার্স্ট নাইটের অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল ডিএমপির। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছিল ঢাকায় বসবাসরত মানুষের বাসাবাড়ির ছাদও। কিন্তু তাতেও থামিয়ে রাখা যায়নি উদযাপন। আতশবাজি আর ফানুসে ভরপুর ছিল ঢাকার আকাশ। তবে এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খল বাহিনীকে কখনো বড়ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

রাজধানীবাসীদের অভিযোগ, পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিকবার সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা রাতের বেলায় নগরীর অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় নির্বিঘ্নে পটকা ফোটাতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের হাতে প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ এসব সামগ্রী বিক্রি ও ব্যবহারের দৃশ্য নিয়মিত হলেও পুলিশকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। তারা দ্রুত দৃশ্যমান অভিযান ও নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে নিষিদ্ধ আতশবাজি-পটকার ব্যবহার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান।

আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া আতশবাজি ও পটকা ফোটানো দণ্ডনীয় অপরাধ। তবুও রাজধানীর আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন অঞ্চল ও হাসপাতালের আশপাশেও বিকট শব্দে পটকা ফোটাতে দেখা যায়। নিষেধাজ্ঞা কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠপর্যায়ে পুলিশ কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নীরবতার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা। একদিকে উৎসব মৌসুমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ওপর বাড়তি চাপ, অন্যদিকে নিষিদ্ধ পটকা বিক্রির পেছনে প্রভাবশালী চক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অভিযান চালানো হয় প্রতীকীভাবে, যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। আইন প্রয়োগে এই দ্বৈততা—ঘোষণায় কঠোরতা, বাস্তবে শৈথিল্য—রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থানকেই দুর্বল করছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, আতশবাজি-পটকা নিষিদ্ধ ঘোষণা কি কেবল আনুষ্ঠানিকতা, নাকি সত্যিই জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ?

চিকিৎসকদের মতে, পটকার বিকট শব্দ শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং হৃদরোগী ও বয়স্কদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। শব্দদূষণের পাশাপাশি আতশবাজির ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।

আতশবাজি, পটকা ফোটানো উড়ানোতে ফানুস প্রতিবছর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলেও তা অমান্য করা হচ্ছে- এবিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটা বেআইনি কাজ। আমরা আমরা জনগণকে সচেতন করার জন্য নিরাপত্তার জন্য নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকি। এখন যারা মানে, তারা তো মানেই। অনেকে হয়তো অমান্য করছে।’

কোনো বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর যদি সেটা তদারকি করা না হয় তাহলে তো নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনো লাভে আছে কি না?- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনি যেটা বলেছেন সেটা আমাদের বিবেচনা করতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘খ্রিষ্টীয় নববর্ষকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে অন্যের জীবনযাত্রায় কোন ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, অন্যের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, আতশবাজির শব্দে মানুষের মধ্যে একটা ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, অসুস্থ ব্যক্তি ও শিশু রয়েছে- এই সকল প্রাসঙ্গিকতাকে বিচার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিবছর নির্দেশনাটা দিয়ে থাকে। নির্দেশনা দেওয়ার পরে বাংলাদেশের মতো দেশে বা সমাজব্যবস্থায় নাগরিকরা একেবারে নিজ দায়িত্বে এ ধরনের নির্দেশনা মানবে বা নাগরিক দায়িত্বশীল হবে প্রত্যেকে প্রত্যেকের জায়গা থেকে- আমরা এতটা সরল বিশ্বাস রাখতে পারি না। নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি এই নির্দেশনাগুলো যারা অমান্য করেছে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘পুলিশের কাছে যখন কোন ঘটনা বড় আকারের ঘটে এবং অভিযোগ যায় তখন তারা কিছু ব্যবস্থা দৃশ্যমান করে। কিন্তু ব্যাপার হচ্ছে পুলিশের নিজের থেকে সক্রিয় থেকে পেশাগত তৎপরতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে যে বা যারাই ভঙ্গ করবে সেটা ছোট বড় বিবেচনায় বা শাস্তির ধরণটাও সেরকম হবে। কিন্তু সবাইকে যদি একটা বড় অংশকে যদি শাস্তির আওতায় আনা যেত এবং এই খবরগুলো যখন যদি গণমাধ্যমে প্রকাশ পেত তখন অন্যদের টনক নড়ত বা সতর্ক থাকতো। কারণ, আমাদের এখানে বলুন অথবা বিশ্বের যেকোনো দেশেই বলুন, মানুষ শাস্তির ভয়েই আসলে আইন মানে। এটি মানতে মানতে যখন তার অভ্যাসে পরিণত হয়, প্রতিদিনের দায়িত্বে পরিণত হয়, তখন সে নিজেই উদ্বুদ্ধ হয় যে, আইন না মানলে সে নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

নাগরিকের পরিবর্তন করার বিষয় তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সমাজের নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। সেই প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা একেবারে নাগরিকের নৈতিকতা তার বিবেক বুদ্ধির ওপরে ছেড়ে দিলে এটা ফলাফল ভালো হয় না। তো সেই জায়গা থেকে আমরা বলছি যে, পুলিশ যেকোনো বিষয়ে যখন কোনো নির্দেশনা দিবে, সে নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন হলো কি না সেটা সে দেখবে, যারা অমান্য করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তিনি যোগ করেন, ‘এটা করতে পারলেই পরবর্তী সময়ে নির্দেশনাগুলোর একটা আলাদা তাৎপর্য বা অর্থ নাগরিকের কাছে তৈরি হবে। অন্যথায়, এই নির্দেশনা নাগরিকের মধ্যে আসলে কোনো পরিবর্তন আনবে না। রাষ্ট্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যেকোনো নির্দেশনা মানা একজন সুস্থ, বিবেকবান ও আইন মান্যকারী নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব। এই সংস্কৃতি তৈরি করতে গেলে যারা অমান্য করবে এদের বিরুদ্ধে শাস্তির এবং প্রচলিত আইন বা নিয়ম কানুন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, এছাড়া কোনো বিকল্প নাই।’

বিজ্ঞাপন

আরো

মেহেদী হাসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর