ঢাকা: ৫০ কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে জুলাইযোদ্ধা সুরভীকে গ্রেফতার- এমন চটকদার শিরোনামে বেশকয়েকটি পত্রিকা ও কয়েকটি টিভি চ্যানেল নিউজ প্রকাশ করলেও মামলার এজাহারে দেখা গেছে, পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তাহরিমা জান্নাত সুরভীর পক্ষে ভয়েজ রেইসের চেষ্টা করছে জুলাই যোদ্ধারা।
এর মধ্যেই সুরভীকে ১৭ বছরের জায়গায় ২১ বছর দেখিয়ে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়া ছাড়াই আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরকে যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। উত্তপ্ত পরিস্থিতি এড়াতে গাজীপুর জেলা জজ আদালত রিমান্ড বাতিল করে জামিন মঞ্জুর করে। সেইসঙ্গে এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবির জায়গায় ৫০ কোটি টাকা- এই তথ্যটি গণমাধ্যমে কে ছড়িয়ে দিল? আর গণমাধ্যম তা যাচাই না করেই কেন প্রকাশ করল? বিষয়টি পরিকল্পিত ও একটি সত্য ঘটনাকে আড়াল করতেই এরকম মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে বলে দাবি জুলাই যোদ্ধাদের।
জুলাইযোদ্ধা ইসলাফিল ফরায়েজী তার ফেসবুক আইডিতে মামলার বাদী দুর্জয়ের ছবি প্রকাশ করে লিখেন, ‘এই সেই দুর্জয়। তাহরিমাকে কক্সবাজারে যাওয়ার কু-প্রস্তাব করে। রাজি না হওয়ায় প্রথমে তাহরিমার নামে ভুয়া সংবাদ প্রচার করে। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে লিয়াজো করে তাহরিমার নামে ৫০ কোটি টাকার মামলা করে। তাহরিমা এখন জেলে, আর দুর্জয়—-সাংবাদিকতা করে।’
হাসান আরেফিন নামে আরেকজন লিখেছেন, ‘দুর্জয় পুলিশের সাথে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে ছবি দেখিয়ে সখ্যতা গড়ে তোলেন। সেদিন সুরভীকে গ্রেফতারের সময় পুলিশ সদস্য ভিডিও করে দুর্জয়কে দিলে তা ছড়িয়ে দেন দুর্জয়। এরপর তার কথাতেই অনেক মিডিয়া ৫ লাখ টাকা চাঁদাদাবির জায়গায় ৫০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি প্রচার করে। সুরভীর বিরুদ্ধে মামলা কোনো প্রকার প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই নিয়েছে পুলিশ। অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনা ছিল যে, প্রাথমিক তদন্ত ছাড়া এ ধরণের কোনো মামলা নথিভুক্ত করা যাবে না।’
আতিকুর রহমান নামে এক জুলাইযোদ্ধা তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘মিডিয়া প্রচার করল ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি, মামলার নথিপত্রে লেখা ৫০ হাজার। পুলিশ এজাহারে উল্লেখ করেছে বয়স ২১, কিন্তু জন্মসনদ অনুযায়ী তার বয়স ১৭। বাদি সাংবাদিকের নামে একাধিক জোচ্চুরির অভিযোগ আছে। বাদি বিবাদীকে কুপ্রস্তাবও দিয়েছিল।’ তিনি আরও লিখেন, ‘গতকাল পর্যন্ত চার্জশিটই সাবমিট করতে পারেনি পুলিশ, আজ রিমান্ড আবেদন করেছে। এবং আদালত রিমান্ড মঞ্জুরও করেছে। তাহরিমা জামান সুরভী’র কেইসে মনোযোগ দিন। আমাদের সিস্টেম কতটা ‘নগ্নভাবে’ নোংরামি করে টের পাবেন।’
এই মামলার বিষয়ে কালিয়াকৈর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার নাসির উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘মামলার ডকেট আমি দেখিনি। এসআই ওমর ফারুক বলতে পারবেন। যে ওসি মামলা গ্রহণ করেছেন তিনি বদলি হয়ে গেছেন। আমি এসে রুটিন মাফিক আসামি গ্রেফতার করেছি।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে কেউ ফোন করেছিলেন কি না? জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘মামলা নথিভুক্তের সময় তৎকালীন ওসি আব্দুল মান্নানকে ফোন করেছিলেন কি না জানা নাই। তবে আসামি গ্রেফতারের জন্য সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজনের ফোন এসেছিল। ফোন করে তারা জানতে চেয়েছেন, মামলা হওয়ার পরও আসামিকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না। এরপর আমরা আসামিকে গ্রেফতার করি।’
আসামি গ্রেফতার হওয়ার পর জানলেন, তিনি একজন জুলাইযোদ্ধা। তদন্ত ছাড়া কীভাবে এক শিশুকে রিমান্ডের আবেদন করলেন? জবাবে ওসি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে অপরাধ কিছুটা প্রমাণিত মনে হওয়ায় রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু তার বয়স যে কম তা জানা ছিল না। এখন সম্পূর্ণ তদন্ত শেষে মামলার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এজাহার দায়েরের সময় বাদী মেডিকেল রিপোর্ট জমা দিয়েছিলেন কি না? জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। নিশ্চয় দেওয়ার কথা। না দিলে মামলা নিলেন কেমন করে। আমি হলে তো নিতাম না।’
এদিকে কালিয়াকৈর থানা সুত্রে জানা গেছে, ‘গত ২৬ নভেম্বর চাঁদাবাজির মামলা দায়েরের পর বাদী সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার মামলা করেছিলেন সুরভী নিজেও। তবে চাঁদাবাজির মামলা হওয়ার পর, এই মামলা দায়ের করায়, স্পর্শকাতর হলেও বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি পুলিশের কাছে।’
ধর্ষণচেষ্টা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি নথি দেখে জানাবেন বলে ফোন কেটে দেন। আর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) ওমর ফারুক ধর্ষণচেষ্টা মামলাটির বিষয় এড়িয়ে যান এবং তিনিও ফোন কেটে দেন। পরবর্তী সময়ে তাকে কল করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাকিল আহমাদ বলেন, ‘চাঁদাবাজি ও ধর্ষণচেষ্টা মামলা দুটোই গুরুত্বপুর্ণ। দুটোই ফৌজদারি অপরাধ। একটির জন্য অন্যটি নেওয়া যাবে না, তা হবে না। দু’টোই নিতে হবে। দু’টোই আলাদা তদন্ত ও আলাদা চার্জশিটের দাবি রাখে। পুলিশ এটিকে গুরুত্ব না দিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হতে পারে।’
জানা গেছে, চাদাঁবাজির মামলায় তাহরিমা জান্নাত সুরভী ছাড়াও ঠিকানাবিহীন আরও তিন ছেলেকে আসামি করেন বাদী। তাদের গ্রেফতারে তেমন উদ্যোগী নন পুলিশ। কারণ, ওই নামগুলো এজাহারে এমনিতেই উল্লেখ করা হয়েছে বলে মনে করছেন জুলাই যোদ্ধারা।
বাদী মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক দুর্জয়ের সঙ্গে সুরভীর প্রেম রয়েছে এমন গুঞ্জনও রয়েছে তার বন্ধু মহলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমন এক বন্ধু সারাবাংলাকে বলেন, ‘দুর্জয়ের সঙ্গে সুরভীর একটা সম্পর্ক রয়েছে। তারা দু’জনে কথা বলেন। একসাথে ওঠাবসা করেন। তথ্য আদান-প্রদান করেন। একসাথে খাওয়া-দাওয়াও করেছেন। দুর্জয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে ছবি দেখিয়েছেন। কক্সবাজার যাওয়ার কথাও বলেছেন। এজন্যই হয়তো দুর্জয় সেদিন গাজীপুরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে আসলে কী ঘটেছে তা বন্ধুমহলে ঠিকভাবে উপস্থাপন করেননি দুর্জয়।’
এদিকে সুরভীর ঘনিষ্টজনদের দাবি, দুর্জয় প্রেমের ফাঁদে ফেলে সুরভীর ক্ষতি করতে চেয়েছিল। গাজীপুরে সেদিন দেখা করতে গিয়ে ধর্ষণচেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সুরভী। এজন্যই আগেভাগে সুরভীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেছে দুর্জয়।
গত বছরের ১৮ নভেম্বর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার গাজীপুরে অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েছিলেন নাকি প্রেমের টানে গিয়েছিলেন তা জানতে ওই সাংবাদিকের অফিসে কল করলে তারা জানায়, দুর্জয় সেদিন কোনো অ্যাসাইনমেন্টে যাননি। পত্রিকাসংশ্লিষ্ট কেউ তাকে গাজীপুরে পাঠাননি। তিনি নিজেই গিয়েছিলেন এবং একটি ঘটনার উদ্ভব হয়েছে।
জানা গেছে, ২১ নভেম্বর অফিসে এলে দুর্জয়ের বর্ণনা শুনে মেয়েটিকে কল করে তার সামনে লাউড স্পিকারে বিস্তারিত শোনে গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ। এরপর দুর্জয়কে বলা হয়, আপনার বর্ণনার সঙ্গে ওই মেয়েটির বর্ণনা মিলছে না। কাজেই সত্য বিষয়টি দুই দিনের মধ্যে প্রমাণ করবেন। না হলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু দুর্জয় কোনো উত্তর না দিয়ে চাকরি থেকে রিজাইন দিয়ে আরেকটি গণমাধ্যমে যোগ দেয়।
এসব বিষয়ে জানতে মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার নাইমুর রহমান দুর্জয়কে সোমবার রাতে ফোন করা হলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।