রাবি: পহেলা বৈশাখ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। এটি কেবল একটি দিন নয়, বরং বাঙালির প্রাণের উৎসব—একটি সর্বজনীন মিলনমেলা, যেখানে ভেদাভেদ ভুলে সবাই একসঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে। পুরোনো বছরের সকল ব্যর্থতা, কষ্ট ও ভুলত্রুটি পেছনে ফেলে নতুন আশায়, নতুন স্বপ্নে জীবনকে নতুনভাবে শুরু করার এক অনন্য প্রেরণা এনে দেয় এই দিনটি।
আগামী মঙ্গলবাদ (১৪ এপ্রিল) বাংলা নববর্ষে মেতে উঠবে দেশ। একইসঙ্গে উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। প্রতি বছরের মতো এবারও নানা আয়োজনে নববর্ষকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও অনুষদের শিক্ষার্থীরা।

সরেজমিনে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, নববর্ষের আয়োজন ঘিরে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত চারুকলা অনুষদ। ক্যাম্পাসজুড়ে চলছে রঙ-তুলির উৎসব, মুখোশ তৈরির কাজ ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রস্তুতি। কেউ ছবি আঁকছেন তো কেউ রং করছেন। বাংলা নববর্ষ উদযাপন ঘিরে এরকম শত কাজে ব্যস্ত শিক্ষার্থীরা। এবার মঙ্গল বা আনন্দ শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করায় এখন হয়েছে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। আর বৈশাখী শোভাযাত্রাকে রাঙিয়ে নানান ভাবে তুলতে চান এই শিক্ষার্থীরা।
রাজশাহীর পবা উপজেলা থেকে ঘুরতে আসা একজন দর্শনার্থী বলেন, ‘প্রতি বছরই আমি এখানে আসি। আঁকাআঁকি করি, আড্ডা দেই। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে আমার এক ধরনের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। না এলে ভালো লাগে না। আমাদের সংস্কৃতিতে আলপনার একটা বিশেষ গুরুত্ব আছে, এখানেও সেগুলো দেখে ভালো লাগে।’
চারুকলা অনুষদের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী নাদিয়া আরা নওশিন বলেন, ‘এবারের আমরা পহেলা বৈশাখের আয়োজনের জন্য একটু বেশি সময়ই পেয়েছি। এবারের পহেলা বৈশাখে আমাদের মুল থিম হলো যেহেতু দেশে এখন বিভিন্ন সংকট ও দূর্যোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাই আমরা চেয়েছি আমরা যেনো বর্তমান বিশ্বে একটু সুন্দর পরিবেশের নাগাল পাই এটা আমাদের এবারের মুল প্রতিপাদ্য। আমরা অনেক কিছু সরবরাহ করেছি, আজকালকের মধ্যে সবকিছু, সব প্রস্তুতি সম্পূর্ণ করবো।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক মোহাম্মদ রায়হান আহমেদ বলেন, ‘আমাদের এবারের পহেলা বৈশাখের আয়োজন ঘিরে রয়েছে সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সার্বিক সহযোগিতা। আমাদের উপকরণ গুলোর মধ্যে যা আমরা বৈশাখের জন্য উপস্থাপন করে থাকি তার মধ্যে রয়েছে জাতীয় মাছ ইলিশ, টমটম ঘোড়া,ছোটো মুখোশ, সড়া, কলস ইত্যাদি। বিশেষ করে আমাদের বাংলা নববর্ষের যিনি প্রবর্তক সম্রাট আকবর এবং বেশ কয়েকজন রাজার মুখমণ্ডল প্রতিকৃতি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি। পহেলা বৈশাখ আমাদের সকলের উৎসব। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা এ উৎসবকে পালন করে থাকি।’
তিনি আরও জানান, এই উৎসবটি বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, মায়ানমার, শ্রীলংকা এবং এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশেও পালন করে থাকে।
পহেলা বৈশাখের দিন নিরাপত্তা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমান বলেন, ‘অন্যান্য বছর থেকে এবারের পহেলা বৈশাখ হবে বৃহৎ আয়োজন এবং অনেক লোকজনের সমাগম হবে বলে আমরা আশা রাখছি। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার জন্য আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করেছি। নিরাপত্তার জন্য আমরা ট্রাফিক, পুলিশ, চেকিং অন্যান্য সকল কিছু কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আমাদের যে প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হবে।’
বৈশাখ মানেই নতুনের আহ্বান, পুরাতনের গ্লানি মুছে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পহেলা বৈশাখ উদযাপন যেন একটি দিনেই সীমাবদ্ধ নয় – এটা বাঙালীয়ানার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত, যা শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় হৃদয়ের এক অনন্য রঙ, সাহস আর শক্তি।