ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের আর্থিক খাতের টেকসই সংস্কার ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এ লক্ষ্যে তারা বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর ব্যাপক সংস্কারের জন্য একাধিক প্রস্তাব পেশ করেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের প্রধান ভবনের ৪র্থ তলার জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে এই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিল জানায়, প্রশাসনিক, অপারেশনাল ও আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যকরভাবে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে না। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জনের দাবি জানানো হয়েছে।
কাউন্সিল বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পদগুলোর মর্যাদা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার ওপর জোর দিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, গভর্নরের পদকে সাংবিধানিক পদে রূপান্তর করে তাকে মন্ত্রীর সমমর্যাদা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ডেপুটি গভর্নর ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর প্রধানের পদগুলো নিয়মিত করে সিনিয়র সচিবের মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
নিয়োগ ও অপসারণ প্রক্রিয়ায় সরকারের একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সার্চ কমিটি বা সংসদীয় কমিটির সুপারিশ এবং অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারি কর্মকর্তাদের আধিক্য কমিয়ে পেশাদার পরিচালকদের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে কাউন্সিল। তারা উল্লেখ করে, ১৯৭২ সালের মূল অর্ডারে সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন মাত্র একজন এবং তিনি ছিলেন নন-ভোটিং সদস্য।
এছাড়া সরকার যাতে ইচ্ছেমতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে না পারে এবং পরিচালনাগত ব্যয়ে সরকারের পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। পর্ষদ গঠন ও বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১-এর সংস্কারের প্রস্তাব করেছে কাউন্সিল। এর মধ্যে রয়েছে—একক পরিবার বা পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকের সংখ্যা কমানো, ব্যাংক পরিচালকদের একনাগাড়ে ১২ বছরের পরিবর্তে ৬ বছরের মেয়াদ নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
কাউন্সিল কর্মকর্তাদের ‘সরল বিশ্বাসে কৃত কর্মের’ জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। দায়িত্ব পালনে হয়রানি বন্ধে প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।
একই সঙ্গে সহকারী পরিচালক থেকে তদূর্ধ্ব পদে শতভাগ মেধাভিত্তিক পদোন্নতি, দেশে-বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি এবং যুগোপযোগী বেতন কাঠামো নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক ও অতিরিক্ত পরিচালক পদকে যথাক্রমে গ্রেড-১, গ্রেড-২ ও গ্রেড-৩-এ উন্নীত করার দাবিও জানানো হয়।
সাম্প্রতিক আর্থিক সংকট ও আমানত সংক্রান্ত সমস্যার প্রেক্ষাপটে কাউন্সিল স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় সংকট উত্তরণের দাবি জানিয়েছে। ‘হেয়ারকাট’ বা আমানত সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আমানতকারীদের প্রতি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার আহ্বানও জানানো হয়।
কাউন্সিল জানায়, গভর্নরের সঙ্গে আলোচনায় এসব বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস পাওয়া গেছে এবং তারা আশা করছে দ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।