চট্টগ্রাম ব্যুরো: নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব-আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার চুক্তি ঠেকানো যাবে না বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন। এ ছাড়া, আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠকের পর উপদেষ্টা বলেছেন, আগামীকাল (শুক্রবার) সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দর সচল করা হবে, কেউ বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যাবে।
এদিকে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বৈঠকের পর আগামীকাল (শুক্রবার) সকাল থেকে কর্মবিরতি ৪৮ ঘণ্টা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’। এর মধ্যে সরকার দাবি মেনে নেওয়ার সুস্পষ্ট ঘোষণা না দিলে আবারও অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হবে বলে পরিষদের নেতারা জানিয়েছেন।
অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে অচলাবস্থার মধ্যে আজ দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন নৌ উপদেষ্টা। বৈঠক শেষে প্রথমে উপদেষ্টা এবং এরপর বন্দর রক্ষা পরিষদের নেতারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরে নৌপরিবহণ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি উনাদের বলেছি, রোজার আগে এই ধরনের আন্দোলন, পোর্ট বন্ধ করে রাখা, এটা অত্যন্ত অমানবিক। আপনাদের যে বক্তব্য সেই বক্তব্য কিন্তু, পোর্ট বন্ধ না করলেও দিতে পারতেন। পোর্ট বন্ধ রাখার কারও কোনো এখতিয়ার নাই। আজকে এভিয়েশন ফুয়েল আটকে আছে, আনার চেষ্টা হচ্ছে। এভিয়েশন ফুয়েল আটকে থাকা মানে বুঝতে হবে আমাদের এখানে এভিয়েশনের কী অবস্থা হবে !’
এনসিটি ইজারার চুক্তি নিয়ে উপদেষ্টার একার কিছু করার নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, আপনাদের বক্তব্য আমি নোট করেছি। আমার ডিসিশন না এটা, আমি জানাব। আমি এখান থেকে গিয়েই উচ্চপর্যায়ে জানাব। সিদ্ধান্ত এগুলো আমার না। সিদ্ধান্ত আমার একার না। সিদ্ধান্তের জন্য একটা কমিটি তৈরি করা হয়েছে। কমিটিকে অবহিত করা হবে।’
তবে চুক্তি ঠেকানো যাবে না জানিয়ে নৌ উপদেষ্টা বলেন, ‘চুক্তি তো হবে, চুক্তি বোধহয় ঠেকানো যাবে না। কিন্তু চুক্তিটা কী লেভেলে হবে সেটাই হচ্ছে কথা। সেটা আমার বক্তব্য আমি দিয়ে এসেছি, একদম পরিস্কার। আমার বক্তব্যের সঙ্গে তারা (শ্রমিক-কর্মচারী) অনেকে একমত হয়েছেন, অনেকে হননি।’
সরকার কোনোকিছু চাপিয়ে দেবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি না, কোনোকিছু চাপিয়ে দেওয়ার মতো কাজ এ সরকার করবে। আমি এটা বলেছি যে, আমি মনে করি এই সরকার এমনকিছু করবে না, পোর্ট এখন যে অবস্থায় আছে, তার থেকে নিচে যাবে। জাতীয় স্বার্থ বাদ দিয়ে কারও সাথে কোনো কথা বলার মতো এ সরকার না, আমি যতদিন দেখেছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি যে, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কোনোকিছুর সাথে আমার মত থাকবে না।’
তবে চুক্তি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কিছু হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নেগোসিয়েশন শেষ হয়েছে কি না, এখনও বলতে পারব না, এখনও চলছে। একটা কথা পরিষ্কার করে বলি, বলা হচ্ছে যে, তড়িঘড়ি করে, তড়িঘড়ি না, প্রায় তিন মাস থেকে নেগোসিয়েশন চলছে। এখানেও লোকজন এসেছে, এটা কবে থেকে, প্রায় ছয় মাস বলতে পারেন।’
আদালত স্থগিতাদেশ দিলে কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোর্ট তো স্থগিতের আদেশ এখনো দেয়নি। দিলে অবশ্যই স্থগিত হবে।’ বন্দর অচল করে রাখার পেছনে ইন্ধন আছে মন্তব্য করে উপদেষ্টা সাখাওয়াত বলেন, ‘এখানে যা যা ঘটছে সেটা যে এখান থেকে ঘটছে তা নয়, এর পেছনে অনেক লোকের ইন্ধন আছে, যেটা আমি মনে করি। এই সব বিষয় আমি ফিরে গিয়ে আলোচনা করব।’
আগামীকাল সকাল থেকে বন্দর সচলের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আশা করি, কাল সকাল থেকে যেভাবে হোক পোর্ট সচল হবে। এখন বিকেলে যেহেতু ভাটার সময়, এখন তো জাহাজ ঢোকানো এমনিতেই যাবে না। তারপরও জাহাজ আমরা আনার চেষ্টা করছি। বলেছি যদি কেউ বাধা দেয়, যারা কাজ করতে চায় তাদের কেউ কেউ বাধা দেওয়ার কথা উঠেছে, বাধা দিলে সরকার হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হবে। সেটা যাতে না হয়, আমি ওদেরকে এটাই অনুরোধ করেছি। পোর্ট বন্ধ রাখা, এভাবে বন্ধ রাখা এটা কোনো সুরাহার পথ না।’
‘কিন্তু আগামীকাল যদি উনারা আবার করেন, তাহলে এটা খুবই আনফরচুনেট হবে। আমি আবার বলছি, আমাদের দেশের ১৮ কোটি লোককে তো জিম্মি রাখা যায় না। পোর্ট যদি কাল সকাল থেকে, আজ তো সময় চলে গেছে, কিন্তু কাল সকাল থেকে যদি সচল না হয়, তাহলে হয়তো সরকার হার্ডলাইনে যেতে বাধ্য হবে।’
তিনি বলেন, ‘আবার বলছি, সামনে রোজা, এর মধ্যে যে কাজটা করা হচ্ছে, এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও আমরা বলব না যে, গত সরকার যেভাবে করেছে আমরা সেভাবে করব। তবে এটা গ্রহণযোগ্য নয়, এটা মানুষকে কষ্ট দেওয়া। এই কষ্টের ভাগ কারা নেবে, দায়িত্ব কে নেবে ? এরা বলে ওদের সমস্যা, ওরা বলে এদের সমস্যা। আমি বলেছি, আপনারা এই পোর্টে কেউ ৩০ বছর, কেউ ২৯ বছর, কেউ ২১ বছর চাকরি করছেন, পোর্টের জন্য আমার চাইতে তো আপনাদের মায়া বেশি থাকার কথা।’
‘যদি আমাদের আরও তিন-চারটা পোর্ট থাকতো, তাহলে আমরা বলতাম যে, এটা আপনারা বন্ধ করে রাখেন, আমরা অন্য পোর্টে চলে যাব। কিন্তু আনফরচুনেটলি এখানে তো দ্বিতীয় কোনো পোর্ট হয়নি। আমরা চেষ্টা করেছিলাম সেকেন্ড পোর্টের কাজটা এগিয়ে নিতে, কিন্তু এটা তো এত সহজে করা যায় না, ইচ্ছে করলেই হয় না। আশা করি, ভবিষ্যতে হবে, পরবর্তী সরকার যারা আসবে তারা সেকেন্ড পোর্টটাও চালু করবেন, যাতে এরকম কোনো ঘটনা ঘটলে, এমন ঘটনা আবার ঘটবে না, এটা তো বলা যায় না।’
আন্দোলনকারী কর্মচারীদের বদলির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেগুলো বদলি করা হয়েছে, সেগুলো আমরা ডেফিনিটলি দেখব। আমি বলেছি, আপনাদের কথা আমি যেখানে যাবার কথা সেখানে পৌঁছাব। বাকিটা যেটা আমার লিমিটের মধ্যে আছে, সেটা আমি কনসিডার করব, পোস্টিং বা ইত্যাদি। কিন্তু আপনারা যদি কো-অপারেট না করেন তাহলে এর বাইরে আর কী করা যায় ! উনারা বলেছেন যে উনারা এটা দেখবেন।’
‘আমি বলেছি, আপনারা আপনাদের মতবাদ যা আছে, সেটা আছে, কিন্তু সেটার জন্য তো আপনারা বাংলাদেশের ১৮ কোটি লোককে জিম্মি রাখতে পারেন না। কারণ, এখানে রোজা আসবে আর কয়েকদিন পরে, আর তিন-চারদিন যদি পোর্ট বন্ধ থাকে, বাজারে কী অবস্থা হবে আপনি চিন্তা করতে পারছেন ! কী কারণে- শুধুমাত্র আপনাদের জেদ। আপনাদের জেদের কারণে, আপনারা যদি বুঝতে না পারেন, হার্ডলাইনে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় আছে ?’
আন্দোলনকারীরা উপদেষ্টার বক্তব্যে আশ্বস্ত হয়েছেন কি-না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি, তাদের আশ্বস্ত হওয়ার কথা। যদি আশ্বস্ত না হয়, তাহলে মনে করব, তাদের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।’
এদিকে উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এ সময় পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা না দেওয়ার জন্য আমরা আমাদের বক্তব্য তুলে ধরেছি। উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি সেগুলো নোট নিয়েছেন এবং ঢাকায় গিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানাবেন। কর্মচারীদের বদলির মাধ্যমে হয়রানি বন্ধ এবং আগের আদেশ প্রত্যাহারের আশ্বাস দিয়েছেন। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে আমরা আগামীকাল (শুক্রবার) সকাল থেকে ৪৮ ঘণ্টার জন্য কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণা দিচ্ছি। দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না এলে রোববার থেকে আবারও লাগাতার কর্মসূচি চলবে।’
নৌপরিবহণ উপদেষ্টার হার্ডলাইনে যাবার হুঁশিয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা এতে ভীত নই।’
গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) থেকে সোমবার পর্যন্ত প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে তিনদিন কর্মবিরতির পর মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি শুরু করেন। এতে চট্টগ্রাম বন্দর পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে।
এ অচলাবস্থার মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে এসে শ্রমিক-কর্মচারীদের তোপের মুখে পড়েন নৌপরিবহণ উপদেষ্টা। আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারীরা বন্দর ভবনে প্রবেশের পথে উপদেষ্টার গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করেন। পরে বন্দর ভবনের ভেতরে উপদেষ্টা হেঁটে ঢোকার সময়ও তারা আশপাশে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় তাদের ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের দালালেরা- হুঁশিয়ার সাবধান, গো ব্যাক অ্যাডভাইজার গো ব্যাক, মা মাটি মোহনা- বিদেশিদের দেব না’- এমন নানা স্লোগান দিতে শোনা যায়। অনেকে উপদেষ্টার গাড়ির সামনে গিয়ে ‘ভুয়া ভুয়া, দালাল দালাল’ বলে স্লোগান দেন।
কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে প্রবেশ করে নৌ উপদেষ্টা বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারী প্রতিনিধি দল এবং বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।