ঠাকুরগাঁও: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে টানাপোড়েনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। ঠাকুরগাঁও জেলায়ও গতকাল রাত থেকে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালকেরা। একইসঙ্গে সেচ নিয়ে উদ্বেগে ভুগছেন স্থানীয় কৃষকেরাও।
ঠাকুরগাঁও পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, জেলায় মোট ৩৭টি পেট্রোল ও ডিজেল ফিলিং স্টেশন রয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ২৪টি, বালিয়াডাঙ্গীতে ২টি, হরিপুরে ২টি, রাণীশংকৈলে ৫টি এবং পীরগঞ্জ উপজেলায় ৪টি স্টেশন। এসব স্টেশনে প্রতিদিন পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের সম্মিলিত চাহিদা প্রায় আড়াই থেকে ৩ লাখ লিটার।
জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ স্টেশনে জ্বালানি নেই। অনেক পাম্পে তেল না থাকায় কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে। কয়েকটি স্টেশনে সীমিত পরিমাণে শুধু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন যানবাহনের চালকেরা। মোটরসাইকেল চালক সোহেল রানা সাঈদ বলেন, ‘নিজের টাকা দিয়ে তেল কিনতে এসেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবু তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কাজকর্মে বড় সমস্যা হচ্ছে।’
ট্রাক চালক আবু জাফর বলেন, ‘ডিজেল না পেলে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। এতে আমাদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
কিছু ক্রেতার অভিযোগ, জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুব হোসেন বলেন, ‘সরকার বলছে দেশে জ্বালানির সংকট নেই, কিন্তু পাম্পে গেলে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।’
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কৃষিক্ষেত্রেও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ে মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৩ হেক্টর। এরমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রায় ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে বিদ্যুৎচালিত এবং প্রায় ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহৃত হয়।
চলতি মৌসুমে জেলায় বোরো ধানের আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬২ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার ৯৪০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে। তবে ডিজেল সংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো সেচ দিতে না পারার আশঙ্কা করছেন।
স্থানীয় কৃষক ফজলুর রহমান বলেন, ‘ডিজেল নিতে এসে পেলাম না। এখন বোরো ধানের চারা কীভাবে লাগাব? তেল না পেলে সেচ দেওয়া সম্ভব নয়।’
আরেক কৃষক নূর জামাল বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কৃষকেরা দুশ্চিন্তায় আছেন।’
তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোছাম্মাৎ শামীমা নাজনীন জানান, রোববার (১৫ মার্চ) পর্যন্ত জেলায় প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮০ লিটার ডিজেল মজুদ রয়েছে।
অন্যদিকে ফিলিং স্টেশন মালিক ও ম্যানেজারদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ না পাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক জানান, জেলার ৩৭টি স্টেশনের মধ্যে কেবল শহরের চারটিতে কিছু তেল এসেছে, বাকি স্টেশনগুলো প্রায় শূন্য।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘কেউ অসাধু উপায়ে জ্বালানির কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে পরিবহন খাতের পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।