Monday 16 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রাজধানীতে বেড়েছে হানিট্র্যাপ, টার্গেট মধ্যবয়সী পুরুষ

মেহেদী হাসান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:০৬ | আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:০৭

হানিট্র্যাপ। ছবি: এআই জেনারেটেড

ঢাকা: রাজধানী ঢাকায় পুরুষদের টার্গেট করে চলছে ‘হানিট্র্যাপ’ বা রূপের ফাঁদ। আর এই ফাঁদে ফেলার জন্য সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র বেছে নিচ্ছে সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও বিত্তবান মধ্যবয়সী পুরুষদের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর প্রেমের অভিনয় করে ফ্ল্যাটে ডেকে নেওয়া হয়। এরপর আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ভুক্তভোগীদের থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এরকমই একজন ভুক্তভোগী হলেন মো. মোখলেছুর রহমান (৫৭)। তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৫০০ টাকা।

ভুক্তভোগী মোখলেছুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘ইভা আক্তার নামের একটি ফেসবুক আইডির সঙ্গে গত বছরের ১ ডিসেম্বর আমার পরিচয় হয়। পরে সেই আইডি থেকে দেখা করার অনুরোধ করা হয়। দেখা হলে সুমি (২৫) নামের মেয়েটি জানায় সে অনেক অসহায়, তার দেখাশোনা করার মতো কেউ নাই। গত ১৫ ডিসেম্বর ডেমরা থানাধীন স্টাফ কোয়ার্টার হোসেন প্লাজার সামনে আমরা দেখা করি। তারপর আমাকে তার সারুলিয়ার রসুল নগরের বাসায় যেতে বলে। সুমির রুমে যাওয়ার ১০ মিনিট পর অজ্ঞাত ৬ থেকে ৭ জন লোক এসে আমাকে রুমের ভেতর আটকের পর মারধর করে ৮ লাখ টাকা দাবি করে। না দিলে খুন করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘জীবন বাঁচাতে তখন সঙ্গে থাকা ৪৮ হাজার ৫০০ এবং এক ভরির দুটি স্বর্ণের আংটি দিয়ে দিই। এমনকি আমার বিকাশ ও নগদে থাকা দুই লাখ টাকা তারা তাদের বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টে নিয়ে যায়। তারপর আমার বন্ধুর কাছ থেকে এক লাখ টাকা ও আমার মেয়ের ননদের স্বামীর থেকে ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং আমার ভাবির থেকে ৬০ হাজার টাকা নিয়ে ওই চক্রকে দিয়ে জীবন নিয়ে ফিরে আসি। আমি আসার আগে তারা আমাকে বলে, এ ঘটনার বিষয়ে আমি যদি কাউকে জানাই তাহলে আমাকে খুন করে ফেলবে। আমাকে বাসা থেকে বের করে দিলে আমি স্থানীয় লোকজনের থেকে ওই চক্রের নাম ঠিকানা সংগ্রহ করে আমার বাসা মাটিকাটা বাজারে হওয়ায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় গত ১৩ জানুয়ারি মামলা করি।’

এদিকে, ওই মামলার সুত্র ধরে হানিট্র্যাপের সঙ্গে জড়িত ‘হানিট্র্যাপ’ চক্রের ছয় সদস্যকে রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করেছে ডেমরা থানা পুলিশ। গ্রেফতাররা হলেন- তুলিয়া আক্তার সুমি (২০), গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়ার চর চান্দুপাড়ায়; ওমর ফারুক (৩২), গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়ার গন্ডাপাড়া নিশান বাড়িয়া; মো. শফিকুল ইসলাম শান্ত (৩৮), গ্রামের বাড়ি বরগুনা সদরের শিয়ালিয়ায়; মো. সজল তালুকদার (৩৮), গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটির রূপচন্দ্রপুরে; দুলালী মীম (২০), গ্রামের বাড়ি রংপুরের কাউনিয়া থানার বুধছাড়ায় এবং ইয়াছিন (৪৩), গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার রসুলবাগ আবাসিক এলাকায়।

এ বিষয়ে ডেমরা থানার তদন্ত কর্মকতা মুরাদ হোসাইন সারাবাংলাকে বলেন, ‘গ্রেফতার মেয়েরা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মধ্যবয়সী লোকদের টার্গেট করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মূলত যাদের টাকা আছে তাদের টার্গেট করেন তারা। ফোন দিয়ে ডেকে এনে আটকিয়ে মারধর ও নির্যাতন করে তাদের থেকে টাকা আদায় করে। ডেমরা ও যাত্রাবাড়ীর দু’টি ঘটনায় মামলা করা হয়েছিল। মামলার প্রেক্ষিতে অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মামলার পর আমরা দেখলাম এর সঙ্গে বড় একটি চক্র জড়িত। তাদের মাধ্যমে এরই মধ্যে বহু লোক প্রতারিত হয়েছে। অনেকে সম্মনহানির ভয়ে থানায় অভিযোগ করেন না। যাদের আমরা গ্রেফতার করেছি, তারা আনুমানিক অন্তত ৫০ লাখ টাকা হানিট্র্যাপের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে।’

যেভাবে পাতা হচ্ছে ফাঁদ

গোয়েন্দা পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতারণার শুরুটা হয় মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। চক্রের সুন্দরী তরুণী সদস্যরা প্রথমে মধ্যবয়সী পুরুষদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। এর পর শুরু হয় চ্যাটিং ও ফোনালাপ এবং ভিডিও কল। এক পর্যায়ে কয়েক দিনের আলাপচারিতার পর ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন করে একান্তে সময় কাটানোর কথা বলে টার্গেটকে নির্দিষ্ট কোনো ফ্ল্যাটে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

ভুক্তভোগী যখন সেই ফ্ল্যাটে যান, তখন চক্রের পুরুষ সদস্যরা সেখানে প্রবেশ করে। এরপর জোরপূর্বক ভুক্তভোগীকে বিবস্ত্র করে বা নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়। এমনকি হত্যার ভয় দেখিয়ে মারধর করা হয়। সম্মানহানির ভয়ে ভুক্তভোগী তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন উপায়ে লাখ লাখ টাকা দিয়ে মুক্তি পান।

কেন মধ্যবয়সীরাই প্রধান টার্গেট

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বয়সের পুরুষরা সাধারণত সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। পরিবারের কাছে বা কর্মক্ষেত্রে মান-সম্মান চলে যাওয়ার ভয়ে তারা পুলিশের কাছে যেতে ভয় পান। আর এই নীরবতাকেই পুঁজি করে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অপরাধীরাও জানে, সম্মান বাঁচানোর জন্য এই শ্রেণির মানুষ যেকোনো পরিমাণ টাকা দিতে রাজি হবে এবং পুলিশের কাছে অভিযোগ করবে না।

তরুণ বা শিক্ষার্থীদের তুলনায় মধ্যবয়সী পুরুষরা ক্যারিয়ারের এমন পর্যায়ে থাকেন যেখানে তাদের হাতে জমানো টাকা থাকে। ব্যাংক ব্যালেন্স, ক্রেডিট কার্ড বা ব্যবসায়িক মূলধন থাকায় তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া সহজ হয়। তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেটের নিরাপত্তা বা ‘ফেক প্রোফাইল’ সম্পর্কে যতটা সচেতন, অনেক ক্ষেত্রে মধ্যবয়সী পুরুষরা ততটা নন। ফেসবুকে কোনো সুন্দরী তরুণীর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট বা ইনবক্সে মিষ্টি আলাপকে তারা অনেকেই ‘নিছক বন্ধুত্ব’ বা ‘সৌভাগ্য’ মনে করে দ্রুত বিশ্বাস করে ফেলেন। এই সরলতাকেই অপরাধীরা পুঁজি করে।

এছাড়া, অনেক মধ্যবয়সী পুরুষ এই বয়সে এসে এক ধরনের একঘেয়েমি বা একাকীত্বে ভোগেন। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবনে রোমাঞ্চের অভাব বা কাজের চাপে মানসিক অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে তারা অনলাইনে নতুন কারও সাথে কথা বলতে আগ্রহী হন। এই আবেগীয় দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধী চক্র খুব সহজেই তাদের প্রেমের জালে জড়ায়।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর