ঢাকা: স্মার্টফোন বাজারে এখন এক ধরনের একঘেয়েমি কাজ করছে একই রকম গ্লাস-স্যান্ডউইচ ডিজাইন, ক্যামেরার সংখ্যার প্রতিযোগিতা, আর পারফরম্যান্সের সামান্য আপগ্রেড। ঠিক এই জায়গাতেই ব্যতিক্রম হয়ে ভিন্ন ধারণা ও ডিজাইন দর্শন নিয়ে বাজারে আসে ব্রিটিশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নাথিং। অল্প সময়েই প্রতিষ্ঠানটি প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। তাদের লক্ষ্য শুধু আরেকটি স্মার্টফোন তৈরি করা নয়, বরং প্রযুক্তিকে আবারও দেখার মতো করে তোলা।
কার্ল পেই ২০২০ সালে নাথিং প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এর আগে ওয়ানপ্লাসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ওয়ানপ্লাস থেকে বের হওয়ার পর তিনি এমন একটি প্রযুক্তি ব্র্যান্ড তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যা শুধু স্পেসিফিকেশন নয়, বরং ডিজাইন, ব্যবহার অভিজ্ঞতা এবং ব্র্যান্ড দর্শন দিয়ে আলাদা হবে। নাথিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তি পণ্যকে আকর্ষণীয় ও ভিন্নধর্মী করে তোলা, যাতে প্রযুক্তি মানুষের কাছে আরও স্বচ্ছ ও সহজ মনে হয়।
নাথিং স্মার্টফোনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছ ডিজাইন এবং গ্লিফ ইন্টারফেস। নাথিং স্মার্টফোন হাতে নিলে প্রথমেই চোখে পড়ে এর স্বচ্ছ ব্যাক প্যানেল। ভেতরের কম্পোনেন্টগুলোকে আংশিকভাবে দৃশ্যমান রেখে তৈরি করা এই ডিজাইন ব্যবহারকারীদের জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। ফোনের পেছনে এলইডি লাইট স্ট্রিপ থাকে, যা কল, নোটিফিকেশন, চার্জিং বা বিভিন্ন অ্যাপের জন্য আলাদা আলাদা আলো দিয়ে সংকেত দেয়।
এই ডিজাইন স্মার্টফোন বাজারে একেবারেই নতুন একটি ধারা তৈরি করেছে। এই ফিচারটি একদিকে যেমন নান্দনিক, অন্যদিকে এটি স্ক্রিন-নির্ভরতা কমানোর একটি বিকল্প নোটিফিকেশন সিস্টেম হিসেবেও কাজ করে। এই ডিজাইন শুধু স্টাইল নয়, এটি একটি নতুন ভিজ্যুয়াল নোটিফিকেশন সিস্টেম তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে স্মার্টফোন ডিজাইনের নতুন ট্রেন্ড তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
নাথিং এখন পর্যন্ত কয়েকটি স্মার্টফোন বাজারে এনেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- নাথিং ফোন ১, নাথিং ফোন ২ এবং নাথিং ফোন ২এ। নাথিং ফোন ১ ২০২০ সালে বাজারে আসে। এতে রয়েছে স্ন্যাপড্রাগন ৭৭৮জি+ প্রসেসর, ১২০ হার্টজ ওএলইডি ডিসপ্লে, ডুয়াল ক্যামেরা, গ্লিফ ইন্টারফেস এলইডি লাইট, নাথিং ওএস (স্টক অ্যান্ড্রয়েডের মতো পরিস্কার ইউআই)।
নাথিং ফোন ২ এটি ফ্ল্যাগশিপ ক্যাটাগরির ফোন। এতে রয়েছে স্ন্যাপড্রাগন ৮+ জেন ১ প্রসেসর, বড় অ্যামোলেড ডিসপ্লে, উন্নত গ্লিফ ইন্টারফেস, ভালো মানের ক্যামেরা ও পারফরম্যান্স এবং দীর্ঘমেয়াদী সফটওয়্যার আপডেট। নাথিং ফোন ২এ এটি মিডরেঞ্জ ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি। এতে রয়েছে মিডিয়া টেক ডাইমেনসিটি প্রসেসর, ভালো মানের ব্যাটারি, ইউনিক ডিজাইন এবং তুলনামুলক কম মূল্য।
নাথিং ফোনে ব্যবহার করা হয় নাথিং ওএস, যা প্রায় স্টক অ্যান্ড্রয়েডের মতো। এতে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ বা বোল্ড ইউআই নেই। ফিচারগুলোর মধ্যে রয়েছে- ডট মেট্রিক্স স্টাইল উইজেট, গ্লিফ ইন্টারফেস কাস্টমাইজেশন, স্মুথ ইউআই, কম ব্লোটওয়্যার, নিয়মিত আপডেট।
বর্তমানে স্মার্টফোন বাজারে অ্যাপল, স্যামসাং, শাওমি, অপো, ভিভো, অনার, রিয়েলমি, টেকনো এই কোম্পানিগুলো ক্যামেরা, ব্যাটারি, প্রসেসর ইত্যাদি স্পেসিফিকেশন প্রতিযোগিতায় এগিয়ে। তাদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে নাথিং মূলত ডিজাইন, সফটওয়্যার অভিজ্ঞতা ও ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি দিয়ে আলাদা জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছে। এটি অনেকটা অ্যাপলের প্রাথমিক ব্র্যান্ড কৌশলের মতো, যেখানে পণ্যের অভিজ্ঞতা ব্র্যান্ড তৈরি করে।
নাথিং শুধু শুধু স্মার্টফোন নয়, এরই মধ্যে তারা বাজারে এনেছে ওয়্যারলেস ইয়ারবাড, স্মার্ট ডিভাইস ইকোসিস্টেম। প্রতিষ্ঠানটি একটি সম্পূর্ণ নাথিং ইকোসিস্টেম তৈরি করতে চায় যেখানে ফোন, ইয়ারবাড, স্মার্ট ডিভাইস একসঙ্গে কাজ করবে। ভবিষ্যতে স্মার্টওয়াচ, আইওটি ডিভাইস, এআই ডিভাইস ইত্যাদি আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, যদি নাথিং তাদের ডিজাইন দর্শন, সফটওয়্যার অপটিমাইজেশন এবং ইকোসিস্টেম কৌশল ধরে রাখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে এটি স্মার্টফোন বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্র্যান্ড হয়ে ওঠতে পারে। স্মার্টফোন বাজারে নাথিং এখনও ছোট খেলোয়াড় হলেও উদ্ভাবনী ডিজাইন ও ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি-এর কারণে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে প্রযুক্তি বিশ্বে একটি আলোচিত নাম হয়ে উঠেছে।