ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক মার্কিন বাহিনীর তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, আপাতত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের শাসনভার কি আরেকটি দেশ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে? মাদুরোকে তুলে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা শাসন-এই দুটি বিষয় কিছু আইনি প্রশ্ন সামনে এনেছে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগের সীমানা কতটুকু তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভেনেজুয়েলায় অভিযানে ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি ভিত্তি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এখনো বিস্তারিতভাবে তাদের এই পদক্ষেপের আইনি ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে অতীতের কিছু অভিযান এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর মন্তব্য থেকে কিছু ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
১৯৮৯ সালে বুশ প্রশাসন পানামার নেতা ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ধরতে সেখানে অভিযান চালিয়েছিল। তখন তারা এই অভিযানকে ‘আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সামরিক সহায়তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। মাদুরোর মতো নরিয়েগার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্র মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল। পেন্টাগন একইভাবে মাদুরোকে তুলে নেওয়ার অভিযানকে বিচার বিভাগের প্রতি ‘সহায়তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘শাসন’ কি বৈধ
যুক্তরাষ্ট্র ‘ভেনেজুয়েলা পরিচালনা করবে’-ট্রাম্পের এমন বক্তব্য প্রথমে শোনার পর মনে হয়েছিল তিনি মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে তার কথা মানতে বাধ্য করবেন।
নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ট্যাবলয়েড দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, ভেনেজুয়েলা চালাতে সেখানে মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হবে কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, যদি ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরা যা চাই সেটাই করেন, তবে আমাদের তা করতে হবে না।’
তবে তিনি সাংবাদিকদের এও বলেছেন, দেশের তেলের স্বার্থে যদি সেখানে সরাসরি সৈন্য পাঠাতে হয় তবে তিনি তাতে মোটেই ‘ভীত নন’।
এখন প্রশ্ন হলো, ডেলসি রদ্রিগেজ যদি ট্রাম্পের কথা মানতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি কীভাবে দেশটি চালাবেন? ট্রাম্প এর কোনো আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করেননি, যা আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞদের বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। যদিও রদ্রিগেজ রোববার (৪ জানুয়ারি) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েই ট্রাম্পের সঙ্গে সহযোগিতার কথা বলেছেন। তারপরও ভেনেজুয়েলা এবং নিকোলাস মাদুরোর ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এরই মধ্যে ডেলসি রদ্রিগেজকে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, রদ্রিগেজ যদি সঠিকভাবে কাজ না করেন, তবে তাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য দিতে হবে।
মার্কিন ম্যাগাজিন দ্য আটলান্টিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব মন্তব্য করেন ট্রাম্প। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যদি তিনি সঠিকভাবে কাজ না করেন, তাহলে তাকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে। সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বেশি।’
‘কারডোজো স্কুল অব ল’–এর অধ্যাপক রেবেকা ইংবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেনেজুয়েলা ‘চালানোর’ কোনো আইনি পথ তিনি দেখছেন না। তিনি বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিক আইনে একটি অবৈধ দখলদারত্বের মতো শোনাচ্ছে এবং ঘরোয়া আইনেও প্রেসিডেন্টের এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই।
ইংবার আরও বলেন, এটি করতে গেলে ট্রাম্পের কংগ্রেসের কাছ থেকে তহবিলের প্রয়োজন হবে।
১৯৮৯ সালের পানামা অভিযান এখানে খুব একটা বড় উদাহরণ হতে পারে না। সে সময় নরিয়েগা নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করলে বিরোধদলীয় প্রার্থী গুইলারমো এনদারাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে শপথ পাঠ করানো হয়েছিল। তখন এনদারাই পানামা চালিয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব নেননি।
অন্যদিকে সোমবার (৫ জানুয়ারি) সিএনএনের এক বিশ্লেষনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় দেশটির বিরোধী দলগুলোকে উল্লাস করতে দেখা গেছে।
শুক্রবার গভীর রাতের এ নাটকীয় ঘটনার পর ভেনেজুয়েলার বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী এবং ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো মন্তব্য করেন, ‘ভেনেজুয়েলাবাসী, স্বাধীনতার মুহূর্ত সমাগত।’
কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে মাচাদোর প্রতি তেমন আগ্রহ দেখাননি। মাচাদোর বদলে তিনি মাদুরোর অনুগত ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। রদ্রিগেজই এখন ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন।