হোয়াইট হাউস থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত কতদিন স্থায়ী হতে পারে, সে বিষয়ে তার সর্বশেষ মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন। তবে তার বক্তব্য ও প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাদের মন্তব্যে স্পষ্ট সময়সূচির বদলে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
ইরানে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর বুধবার (১ এপ্রিল) রাতে প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প। এসময় তিনি বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক লক্ষ্য “খুব শিগগিরই, খুবই শিগগির” অর্জন করতে যাচ্ছে।
ট্রাম্প আমেরিকানদের মনে করিয়ে দেন, এই সংঘাত এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো বহু বছরব্যাপী যুদ্ধের তুলনায় অনেক কম সময় ধরে চলছে। এরপর তিনি একটি হালনাগাদ সময়সীমা দেন। তিনি বলেন, “আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আমরা তাদের প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেব, যেখানে তাদের থাকার কথা।”
এই মন্তব্য প্রথমবারের মতো নয় যে ট্রাম্প বা তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা কোনো সময়সীমা উল্লেখ করেছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন ট্রাম্প এই অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন, তখন তিনি বলেন, এটি চলবে “আমাদের লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যতদিন প্রয়োজন”।
এরপর থেকে প্রেসিডেন্ট কখনও বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে যুদ্ধ জিতে গেছে, আবার কখনো বলেছেন সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ চলবে—সাধারণত দুই থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে। যুদ্ধের ছয় সপ্তাহ পূর্ণ হবে ১১ এপ্রিল।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকরা বলেন, জনসমর্থন পাওয়ার জন্য কোনো সংঘাতের সময়সীমা নির্ধারণ করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের জন্য স্বাভাবিক—যদিও পরে সেই হিসাব পরিবর্তন করা হয়। তবে একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পদ্ধতি কিছুটা ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইঙ্গিত দেন যে এই পরিবর্তনশীল সময়সীমা কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে। বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন: “আপনি আপনার শত্রুকে বলবেন না আপনি কী করতে যাচ্ছেন বা কী করবেন না এবং কখন থামবেন তাও বলবেন না।”
তিনি আরও বলেন, “ট্রাম্প চার থেকে ছয় সপ্তাহ, ছয় থেকে আট সপ্তাহ-তিনটি সময় বলেছেন। এটি যেকোনো সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু আমরা কখনই সঠিক সময়সীমা প্রকাশ করব না, কারণ আমাদের লক্ষ্য হলো সেই উদ্দেশ্যগুলো পূরণ করা এবং আমরা সেই পথে ভালোভাবেই এগোচ্ছি।”
সংঘাত চলতে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তারাও যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হতে পারে সে বিষয়ে নিজস্ব পূর্বাভাস দিয়েছেন—যা কখনো কখনো প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে। গত ৮ মার্চ প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সিবিএস নিউজের ‘60 Minutes’ অনুষ্ঠানে বলেন, এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে তা “মাত্র শুরু”। ২৪ ঘণ্টারও কম সময় পর প্রতিরক্ষা বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই বার্তা দেয়: “We have Only Just Begun to Fight.”
তবে একইদিনে ফ্লোরিডায় এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তার সামরিক লক্ষ্য অর্জনের দিকে “বড় অগ্রগতি” করেছে এবং যোগ করেন- “কেউ কেউ বলতে পারে এগুলো প্রায় সম্পন্ন।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজস্ব মন্তব্য করেছেন, যা অনেক সময় ট্রাম্প ও হেগসেথের বক্তব্যের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে। তিনি মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে বলেন, “আমরা শেষটা দেখতে পাচ্ছি। আজ নয়, কাল নয়, কিন্তু সেটা আসছে।”
এ ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়া ট্রাম্প প্রশাসনই প্রথম নয়। অনেক সময় প্রেসিডেন্টদের দেওয়া সময়সীমা অস্পষ্ট থাকে, আবার কখনো নির্দিষ্ট হয়। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই যুদ্ধগুলো প্রধান সেনাপতির পূর্বাভাস অনুযায়ী শেষ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের অধ্যাপক এরিক মিন বলেন, যুদ্ধের সময়সীমা নির্ধারণ করা একটি জটিল কাজ। তিনি বলেন, “যুদ্ধ কতদিন চলবে তা নির্ধারণ করা সত্যিই কঠিন।”
১৯৬৭ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন ভিয়েতনাম যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে বলেন, “টানেলের শেষে আলো দেখা যাচ্ছে”—যা ছিল যুদ্ধবিরোধী জনমত প্রশমিত করার একটি চেষ্টা।
অনেক বছর পরে, ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইঙ্গিত দেন যে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর বোমা হামলা সংক্ষিপ্ত হতে পারে, কিন্তু তা দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলে।
এরপর আসে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ-এর বহুল আলোচিত “Mission Accomplished” ভাষণ, যা তিনি ইরাক যুদ্ধে মাত্র দুই মাস পর একটি যুদ্ধজাহাজে দাঁড়িয়ে দেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা ইরাক ছাড়ে ২০১১ সালে।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের ইতিহাসবিদ থমাস প্যাটারসন বলেন, “যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই জনসাধারণের কাছে সময় কেনার জন্য সময়সীমা দেন”—এবং “প্রায় সবাইই সময় কম ধরে অনুমান করেন।”
তবুও বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্পের অবস্থান আলাদা, কারণ প্রেসিডেন্ট ও তার উপদেষ্টারা বারবার সময়সীমা ও যুদ্ধের যৌক্তিকতা পরিবর্তন করেছেন।
মিন বলেন, “প্রশাসনের ভেতরে অবস্থানের এই অসামঞ্জস্য বেশ ব্যতিক্রমী। ইতিহাসে এর তেমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া কঠিন।”
অন্যদিকে হোয়াইট হাউস এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং গত মাসে ক্যারোলিন লিভিট বলেন, “ট্রাম্প ও তার পুরো টিম ধারাবাহিকভাবে স্পষ্ট লক্ষ্য তুলে ধরেছে।”
এদিকে বুধবার ট্রাম্পের জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণটি ছিল বহুল প্রতীক্ষিত, কারণ ধারণা করা হচ্ছিল তিনি হয়তো বড় কোনো ঘোষণা দেবেন। ওয়াশিংটনে ধারণা করা হচ্ছিল, ট্রাম্প হয়তো ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর ঘোষণা দেবেন, অথবা যুদ্ধ কমানোর কথা বলবেন। কিন্তু এর বদলে ট্রাম্প আরেকটি নতুন সময়সীমার কথা বলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধ কবে শেষ হবে—এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প “দুই থেকে তিন সপ্তাহ” বললেও তার প্রশাসনের অন্যান্য বক্তব্যে তা অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে, এটি শুধু সামরিক সংঘাত নয়—বরং কৌশল, রাজনীতি এবং জনমতের জটিল সমীকরণ, যেখানে সময়সীমা নিজেই একটি কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
বিবিসি থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত।