মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে তেহরান। দেশটির নারী ও শিশুরা জ্বালানিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার চারপাশে মানবঢাল তৈরি করে অবস্থান নিয়েছে। এদিকে, ট্রাম্প আবারও নিশ্চিত করেছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলটিমেটাম শেষ হওয়ামাত্র তিনি ইরানজুড়ে তাণ্ডব চালাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা ইরানের স্থানীয় সময় বুধবার (৮ এপ্রিল) ভোর সাড়ে ৪টায় শেষ হওয়ার কথা।
এর মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে লেখেন, ‘আজ রাতেই একটি সভ্যতা (ইরান) সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।’
এদিকে ট্রাম্পের দেওয়া সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইরান সরকার দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সামনে মানবঢাল তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভিডিও বার্তায় সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইয়ুথ অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্টস’র সচিব আলিরেজা রাহিমি দেশটির জনগণকে মানবঢাল তৈরির আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের সব তরুণ, ক্রীড়াবিদ, শিল্পী, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ঘিরে মানবশৃঙ্খল গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি। তিনি জানান, স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় দেশজুড়ে বিভিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সামনে এই কর্মসূচি শুরু হবে, যার নাম দেওয়া হয়েছে “Human Chain of Iranian Youth for a Bright Tomorrow” (উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ইরানি যুবকদের মানব শৃঙ্খল)।
রাহিমি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো জাতীয় সম্পদ এবং রাজনৈতিক মতভেদ নির্বিশেষে এগুলো ইরানের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পত্তি, এগুলো রক্ষা আমাদের দায়িত্ব। তিনি আরও বলেন, এসব অবকাঠামোয় হামলা “যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
পরে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের কাজারুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে মানুষদের মানবশৃঙ্খলে অংশ নিতে দেখা যায়।
সংবাদমাধ্যমের বরাতে বলা হয়েছে, আহভাজফুল এলাকা সেতু ও রাজাই পাওয়ার প্ল্যান্ট, বিসোতুন পাওয়ার প্লান্ট এবং তাব্রিজকেন্দ্রের জনতাকে জড়ো হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম নূর নিউজ জানিয়েছে, দেশজুড়ে বিভিন্ন এনজিওর প্রায় ২ হাজার তরুণ এসব স্থানে জড়ো হয়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়, এ সময় তেহরানের অন্তত একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপত্তার কারণে ঘিরে ফেলা হয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, আহভাজ শহরের পল সেফিড সেতুতে কয়েক ডজন মানুষ ইরানের পতাকা হাতে সমাবেশ করেছে।
এই কর্মসূচিতে একটি ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণও দেখা যায়। সংগীতশিল্পী আলী ঘামসারি দামভান্দ বিদ্যুৎ কেন্দ্র-এর সামনে তার বাজিয়ে শান্তির বার্তা দেন। তিনি বলেন, “আমি আশা করি আমার তারের সুর শান্তিতে প্রভাব ফেলবে।”
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানকে লক্ষ্য হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আজ রাতেই একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে’। এর আগে তিনি ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু লক্ষ্য করে হামলার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। ট্রাম্প কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হতে পারে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংসের কথাও উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের হুমকির পর ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। তবে পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, মার্কিন বা ইসরায়েলি স্থল আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ মিলিয়ন ইরানি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেওয়ার আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। তিনি বলেন, তিনি নিজেও ইরানের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, “সভ্য জাতির সংস্কৃতি, যুক্তি ও ন্যায়বিচারের শক্তি শেষ পর্যন্ত নির্মম শক্তিকে পরাজিত করবে।”
ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, ইরান হাজার বছরের ইতিহাসে বহু চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছে এবং ট্রাম্পের হুমকিতে ভীত হবে না। তিনি বলেন, “আমাদের প্রতিক্রিয়া হবে দৃঢ় থাকা এবং জাতির অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর নির্ভর করা।”