Thursday 09 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা, যুদ্ধবিরতি কি ভেস্তে যাবে?

আবু সাঈদ সজল নিউজরুম এডিটর
১০ এপ্রিল ২০২৬ ০০:০৬ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ ০০:৪৮

লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার ফলে সদ্য ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চালানো এসব হামলায় একদিনে ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। যা চলমান সংঘাতের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ইসরায়েল জানিয়েছে, এসব হামলায় হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের এক সহযোগীকেও হত্যা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেবাননকে ঘিরে মতবিরোধই এখন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় আশঙ্কার কারণ হয়ে  দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে শান্তির যে আশা তৈরি হয়েছিল—তা দ্রুতই ভেস্তে  যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধবিরতির পরই বড় হামলা

দুই সপ্তাহের জন্য ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই লেবাননের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইসরায়েল। বৈরুত, বেকা ভ্যালি ও দক্ষিণ লেবাননের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাও এ হামলার শিকার হয়।

লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, এসব স্থানে অন্তত ২৫৪ জন নিহত ও ১ হাজার ১৬৫ জন আহত হয়েছে।

লেবাননের চিকিৎসক সমিতির প্রধান এলিয়াস শ্লেলা এক লিখিত বিবৃতিতে জরুরি ভিত্তিতেসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের যেকোনো হাসপাতালে গিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানান। বৈরুতের একটি বড় হাসপাতাল সব ধরনের রক্তদানের প্রয়োজনের কথাও জানান তিনি।

জাতিসংঘ হতাহতের এই সংখ্যাকে “ভয়াবহ” বলে বর্ণনা করেছে এবং মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এই ধ্বংসযজ্ঞকে “ভীতিকর” বলেছেন।

ইসরায়েল প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছে যে তারা হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করছে। তবে লেবাননের কর্মকর্তারা ও ত্রাণ সংস্থাগুলো জানিয়েছে, পুরো পাড়া ধ্বংস হয়ে গেছে, হাসপাতালগুলো চাপের মুখে এবং জরুরি সেবা ব্যবস্থা হিমশিম খাচ্ছে।

পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলাকে ‘পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ’ বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আজকের এই অপরাধটি সেই সময় ঘটেছে যখন অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে—যা ইসরায়েল ও তাদের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

যুদ্ধবিরতিতে ‘লেবানন’ অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিভ্রান্তি

যুদ্ধবিরতির পরিধি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ এখন সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দাবি করেছেন, যুদ্ধবিরতিতে সব ফ্রন্টে হামলা বন্ধ অন্তর্ভুক্ত ছিল—বিশেষ করে লেবানন। একই অবস্থান নিয়েছে ইরানও।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন, লেবাননের সংঘাত ‘আলাদা বিষয়’ এবং তা যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে না।

যুদ্ধবিরতিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যা বলছে

এই মুহূর্তে প্রধান কূটনৈতিক বিরোধ হলো—লেবানন যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত কি-না, কারণ যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের কর্মকর্তারা ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

বুধবার এক্সে দেওয়া পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ লেখেন, ‘আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদেরসহ লেবাননসহ সর্বত্র অবিলম্বে কার্যকর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ তার দেশ এই যুদ্ধবিরতির মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে।

ইরানও বলেছে, এই যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তা কার্যকর করতে আহ্বান জানিয়েছে।

শরিফের ঘোষণার উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধবিরতি বা ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া—এর মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে।’

তিনি এক্সে লেখেন, ‘দুটো একসঙ্গে হতে পারে না। বিশ্ব লেবাননে হত্যাকাণ্ড দেখছে। এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে।’

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেন, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে চুক্তি ভেঙে যেতে পারে এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার সময় বলেন, এটি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ‘সম্পূর্ণভাবে শত্রুতা বন্ধ’ করবে। তবে পরে তিনি স্পষ্ট করেন, লেবানন ‘আলাদা সংঘর্ষ।’

এই অবস্থানকে জোরদার করেছেন অন্যান্য মার্কিন কর্মকর্তারাও। হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমার মনে হয় ইরান ভেবেছিল যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু তা ছিল না।’

ইসরায়েলও একই অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, এই যুদ্ধবিরতি ‘লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয় এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলবে।’

ইরানের জন্য যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকে কেন গুরুত্বপূর্ণ?

লেবানন ইস্যুই এই যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে দুর্বল দিক। হিজবুল্লাহ তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র এবং ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—যেখানে ইয়েমেনের হুতি ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীও রয়েছে।

ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে প্রথম হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করার পর হিজবুল্লাহ এই সংঘাতে জড়ায়। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে, ইসরায়েলের প্রায় প্রতিদিনের লঙ্ঘন সত্ত্বেও, হিজবুল্লাহ কোনো হামলা চালায়নি।

এদিকে বুদাপেস্টে ভ্যান্স বলেন, লেবানন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রস্তাবিত আলোচনা ভেঙে দেওয়া ইরানের জন্য ‘বোকামি’ হবে।

তিনি বলেন, ‘ইরান যদি এমন একটি সংঘাতে, যেখানে তারা চাপে রয়েছে, লেবাননের কারণে আলোচনা ভেঙে দিতে চায়—যার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং যা কখনোই যুদ্ধবিরতির অংশ ছিল না—তা তাদের সিদ্ধান্ত। আমরা মনে করি এটা বোকামি।’

তবে ভ্যান্সের দাবির বিপরীতে, লেবাননের সঙ্গে ইরানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে শর্তগুলো দিয়েছে, তার একটি হলো—তেহরান যেন তার আঞ্চলিক মিত্রদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করে।

লেবাননকে বাদ দিয়ে যুদ্ধবিরতি হলে ইরানের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা কৌশল দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। হিজবুল্লাহ দুর্বল হলে এবং ইরানের ওপর হামলা বন্ধ থাকলে তেহরান তার প্রভাব ও বিশ্বাসযোগ্যতা—দুটিই হারাতে পারে।

এছাড়া, নিজের সহায়তায় এগিয়ে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে রক্ষা না করলে, কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া অনুযায়ীই ইরান হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।

কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ লেবাননকে এই যুদ্ধবিরতির “অ্যাকিলিস হিল” বলে উল্লেখ করেছেন।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি ইরানকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করতে পারে, যাতে প্রতিরোধের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং হিজবুল্লাহর জন্য ইরানকে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে দেখানো যায়।’

‘ইসরায়েল চেষ্টা করবে ইরানের অবস্থান যাচাই করতে, কোথায় চাপ দেওয়া যায় তা পরীক্ষা করতে।’

বিশ্বশক্তির উদ্বেগ

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াগুলো মূলত লেবাননে ইসরায়েলের হামলার মাত্রার নিন্দা এবং যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।

কয়েকটি দেশ এই হামলাকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। কাতার ‘নির্মম ধারাবাহিক হামলা’র নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

মিসর বলেছে, এই হামলা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা নস্যাৎ করার জন্য ইসরায়েলের ‘পূর্বপরিকল্পিত উদ্দেশ্য’ প্রকাশ করে। তুরস্ক বলেছে, এসব হামলা লেবাননের মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ করছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক্সে লিখেছেন, এসব হামলার প্রেক্ষিতে নেতানিয়াহুর ‘জীবন ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা অগ্রহণযোগ্য।’

ফ্রান্সও ইসরায়েলের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং যুদ্ধবিরতিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়ভেট কুপার বিবিসিকে বলেছেন, লেবাননকেও যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তিনি লন্ডনে ম্যানশন হাউসে দেওয়া ভাষণে এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি লেবাননে ইসরায়েলের হামলাকে “সম্পূর্ণ ভুল” বলে বর্ণনা করেন।

ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘লেবাননে চলমান সামরিক কার্যক্রম’ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির জন্য ‘গুরুতর ঝুঁকি’ তৈরি করছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস বলেন, ইসরায়েলের পদক্ষেপ যুদ্ধবিরতির ওপর ‘গুরুতর চাপ’ সৃষ্টি করছে এবং এই সমঝোতা ‘লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া উচিত’।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তারা চলমান যুদ্ধবিরতিকে ‘অবজ্ঞা’ করেছে। অন্যদিকে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল ইসরায়েলকে লেবাননে সামরিক অভিযান ‘আত্মরক্ষার মধ্যে সীমিত’ রাখার আহ্বান জানান।

শনিবার ইসলামাবাদে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা যুদ্ধবিরতির পরিধি নিয়ে বড় ধরনের মতবিরোধ ও বিভ্রান্তি, স্থায়ী সমাধানের আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই এটি ভেঙে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।


আলজাজিরার বিশ্লেষণ থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে ভাবানুবাদ। 

বিজ্ঞাপন

আরো

আবু সাঈদ সজল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর