Monday 13 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ইসলামিক ন্যাটো না ইউরোপ
কোন দিকে ঝুঁকছে উপসাগরীয় দেশগুলো?

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক
১৩ এপ্রিল ২০২৬ ২০:১২ | আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ২০:৩৩

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ‘সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার’ সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে অথাৎ গত ৭ এপ্রিল একটি নাটকীয় ঘোষণা আসে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই শান্তি এখন ঝুলন্ত অবস্থায় আছে, কারণ ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা কোনো সমাধান ছাড়াই ভেঙে গেছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় ফাটল

ইতিহাস সাক্ষী, পশ্চিম এশিয়ার প্রতিটি বড় যুদ্ধই অঞ্চলের ক্ষমতার রাজনীতি বদলে দিয়েছে। ১৯৪৮-এর আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ, ১৯৫৬-এর সুয়েজ সংকট কিংবা ১৯৭৩-এর ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধ, প্রতিটি সংঘাতই নতুন কোনো বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালের এই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম নয়। এই যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সঙ্গী যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মোহভঙ্গ?

সৌদি আরবসহ জিসিসি ভুক্ত দেশগুলো কয়েক দশক ধরে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে আসছে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি আচরণ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থের চেয়ে ইসরায়েলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া এই সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছে। যুদ্ধের সময় দেখা গেছে, ইরানের ছোঁড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ৮৩ শতাংশই আঘাত হেনেছে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে, যেখানে ইসরায়েলের দিকে ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ। এর ফলে আরব দেশগুলো বুঝতে পেরেছে, ইরানের মূল লক্ষ্য ছিল পুরো অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল করে বিশ্বজুড়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়া।

বিকল্প কি ইউরোপ?

যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী ভূমিকার বিপরীতে ইউরোপ কিছুটা সংযত অবস্থান নিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইরানে সেনা পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে সামরিক প্রযুক্তির জন্য এখনো ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ ইউরোপের ‘কৌশলগত স্বাধীনতার’ ডাক দিলেও বাস্তবে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া ইউরোপ এখনো অসহায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে ভারত, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলোকে সাথে নিয়ে ইউরোপ একটি নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক বলয় তৈরির সম্ভাবনা জাগিয়ে রেখেছে।

ন্যাটো এবং ট্রাম্পের হুমকি

এই যুদ্ধ ন্যাটো জোটের ভেতরেও অস্থিরতা তৈরি করেছে। ট্রাম্প ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং সদস্য দেশগুলোকে সামরিক বাজেট জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করতে চাপ দিচ্ছেন। এমনকি গ্রিনল্যান্ড দখল করার হুমকি এবং মিত্রদের প্রতি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে তিনি আটলান্টিক সম্পর্কের ব্যাপক ক্ষতি করেছেন।

‘ইসলামিক ন্যাটো’ কি সম্ভব?

বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠনের আলোচনা আবারও সামনে আসছে। ১৯৫০-এর দশকে এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিয়ে ‘সেন্টো’ (CENTO) গঠিত হয়েছিল যা ১৯৭৯ সালে ভেঙে যায়। বর্তমানে পাকিস্তান এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি যেকোনো মুসলিম সামরিক জোটের জন্য মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করতে পারে।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। ইরান হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ করেছে যে বিশ্ব রাজনীতিতে ভৌগোলিক অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ইসরায়েল এই সুযোগে লেবাননের দক্ষিণ অঞ্চলে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়ে একটি ‘বাফার জোন’ তৈরি করেছে।

আগামী দুই সপ্তাহ নির্ধারণ করবে এই অঞ্চলের ভাগ্য; শান্তি আসবে নাকি বিশ্ব এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ধাবিত হবে।

(মূল লেখক: দিব্যম শর্মা, কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ বিষয়ক গবেষক এবং এনডিটিভি-র সাবেক সাংবাদিক)

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর