Thursday 19 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ফিরে দেখা ২০২৫
সংস্কার থেকে নির্বাচনের পথে যাত্রা

নাজনীন লাকী স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৩ জানুয়ারি ২০২৬ ২৩:২৮ | আপডেট: ৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০০

ফিরে দেখা ২০২৫। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ ছিল বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জন্য সংস্কার ও প্রস্তুতির বছর। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের গুরুভার কাঁধে নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন বছরজুড়েই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থেকে শুরু করে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতের মতো যুগান্তকারী সিদ্ধান্তে বদলে গেছে দেশের নির্বাচনি মানচিত্র।

নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার

২০২৫ সালের শুরুতে ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বাধীন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচনি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হয়।

বিজ্ঞাপন

আরপিও সংশোধন

নির্বাচনের দিন অনিয়মের কারণে পুরো ভোট বাতিল করার ক্ষমতা ফিরে পায় কমিশন, যা আগে খর্ব করা হয়েছিল।

কঠোর শাস্তির বিধান

হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে সংসদ সদস্য পদ বাতিলের বিধান আনা হয়েছে। এছাড়া আদালতের দৃষ্টিতে ফেরারি আসামিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।

‘না’ ভোট

শুধু একক প্রার্থীর আসনের ক্ষেত্রে ‘না’ ভোটের বিধান পুনরায় চালু করা হয়েছে।

ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও আইন সংশোধন

প্রথমবারের মতো এক বছরে তিনবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চলতি বছরের ২ মার্চ প্রথম ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর দ্বিতীয় ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয় গত ৩১ আগস্ট। আর সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ১৮ নভেম্বর। সবশেষ ভোটার তালিকা অনুযায়ী দেশে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ।

ইভিএম’র বিদায়, ব্যালটে প্রত্যাবর্তন

প্রযুক্তিগত অনাস্থা ও জনদাবির মুখে বিতর্কিত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) চিরতরে বাতিল করে কমিশন। সেইসঙ্গে ব্যলটে নির্বাচন পরিচালনার সিদ্ধান্ত ফিরে আসে।

আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত

২০২৫ সালের ১২ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনা ও ছাত্র-জনতার দাবির মুখে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন । জুলাই-আগস্টের গণহত্যায় দলটির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ বিচারাধীন থাকায় এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে দলটির নির্বাচনি প্রতীক নৌকা ব্যবহার এবং যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নেয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সেসঙ্গে দলটির সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যক্রমও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আর একেবারে নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্রলীগকে।

জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন

আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত হওয়ার সমসাময়িক সময়েই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই চূড়ান্ত রূপ পায়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এক যুগ পর দলটি প্রতীকসহ নিবন্ধন ফিরে পায়।

সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও ৪২ আসনে পরিবর্তন

জুলাই মাসে কমিশন সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া অনুযায়ী, জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যার আনুপাতিক হার ঠিক রাখতে ৩৯টি সংসদীয় আসনে বড়ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করে ইসি। ফলে, গাজীপুরে একটি আসন বাড়লেও ভোটার সংখ্যা হ্রাসের কারণে বাগেরহাটে একটি আসন কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। বাগেরহাটে একটি আসন কমানো নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এছাড়াও ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনাও ঘটে। এ ক্ষেত্রে ইসি তার অবস্থানে অনড় থাকলেও আদালতের আদেশে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫টি আসনের সীমানা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।

ভোটার তালিকায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২৭ ডিসেম্বর সশরীরে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডিসংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করেন। এর মাধ্যমে তার আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ও ভোট দেওয়ার আইনি বাধা দূর হয়।

রাজনৈতিক দল নিবন্ধন ও পুনর্বহাল

নির্বাচনে অংশ নিতে ইসির কাছে ১৪৩টি দলের নিবন্ধন আবেদন জমা দেয়। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে ৪৩টি দল শর্ত পূরণের জন্য কাগজ জমা দেয়, আর বাকি দলগুলোর নিবন্ধন আবেদন বাতিল করে দেয় ইসি। মাঠপর্যায়ের তদন্ত শেষে এনসিপি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টিকে নিবন্ধন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দাবি-আপত্তি আহ্বান করে সংস্থাটি। পরবর্তী সময়ে এনসিপি ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) দাবি-আপত্তি না আসায় নিবন্ধন চূড়ান্ত করে ইসি। আর বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টির কার্যক্রম আরও যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়। এছাড়া, কয়েকটি দলের মাঠ তদন্তের পরও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করে সংস্থাটি।

অন্যদিকে ধাপে ধাপে যাচাই ও পুনর্বিবেচনার আবেদন আমলে নিয়ে আমজনতার দল, জনতার দল ও বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টিকে (বিইপি) নিবন্ধন দেওয়া হয়। আদালতের আদেশে নিবন্ধন পায় বাংলাদেশ নেজামী ইসলামি পার্টি। শেষ পর্যন্ত, নতুন ছয়টি দল নিয়ে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৯। এছাড়া আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত হয়েছে। বাতিল হয়েছে পিডিপি, ফ্রিডম পার্টি ও ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলনের নিবন্ধন।

এদিকে, এই প্রথম দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে টানা ১২৫ ঘণ্টা অনশন করে বেশ আলোচনায় ছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন ‘আমজনতার দল’।

এনসিপির ‘শাপলা’ প্রতীক নিয়ে বিতর্ক

দল নিবন্ধন পেলেও ‘শাপলা’ প্রতীক ছাড়া নিবন্ধন না নেওয়ার ঘোষণা দেয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। পরবর্তী সময়ে বিধিমালা সংশোধন করে প্রতীক তালিকায় ‘শাপলা কলি’ যুক্ত করা হলে তা গ্রহণ করে জুলাই পরবর্তী তরুণ দলটি।

প্রবাসীদের জন্য আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট

প্রথমবারের মতো প্রবাসী ও ভোটের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েদিদের ভোটাধিকার নিশ্চিতে আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি চালু করে নির্বাচন কমিশন ।

রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ ইসির

ইসির নির্বাচনী সংলাপে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, নারী নেত্রী, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন পেশাজীবীর সঙ্গে আলোচনা করেছে সংস্থাটি। ইসির সংলাপে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ ৩৪টি দল অংশ নেয়। যে সাত দল এবার আমন্ত্রণ পায়নি- সেগুলো হলো, জাতীয় পার্টি-জেপি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এম.এল), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, জাতীয় পার্টি-জাপা, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ও বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন। অন্যদিকে জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে সংলাপ করার কথা থাকলেও তা করতে পারেনি ইসি। এছাড়া, সংলাপের সময় শেষ হওয়ার পর নিবন্ধন পাওয়া পাঁচটি দল এতে অংশ নিতে পারেনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও গণভোটের তফসিল ঘোষণা

‎বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন কর্তৃক জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা। এদিন ‘জুলাই সনদ’ ও সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়।

ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা

সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীকে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালটি ছিল মূলত ‘সংস্কার থেকে নির্বাচনের পথে’ যাত্রার বছর।

সারাবাংলা/এনএল/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

নাজনীন লাকী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর