Wednesday 04 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

গতবছর অভিবাসী শ্রমিক বেড়েছে ১২ শতাংশ, বেড়েছে নারী অভিবাসনের হারও

অপূর্ব কুমার, ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট
৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:২১ | আপডেট: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৪৪

অভিবাসী শ্রমিক। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে লোক পাঠানো প্রায় বন্ধ হলেও গত বছরে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর হার বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় এবার অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। নারী কর্মী পাঠানোর হারও আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে। যদিও গত বছরে শ্রমিক অভিবাসীদের ৬৭ শতাংশই গেছেন সৌদি আরবে।

সরকারি হিসাবে, গতবছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র ৫টি দেশে। একজন করে কর্মী গেছেন মাত্র ১৩টি দেশে। ৩৪টি দেশে ২ থেকে ১০ জন করে কর্মী গেছেন। যেসব দেশে ১০০ জনের কম অভিবাসী কর্মী যান, সেসব দেশকে অভিবাসনের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা শোভন নয়।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি ২০২৫: অর্জন ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকাশ করে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। আগের বছরের তুলনায় এর অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে। এ সংখ্যা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন। এরপর কাতারে ১০ শতাংশ, ৬ শতাংশ সিঙ্গাপুরে, কুয়েতে ৪ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৪ শতাংশ কর্মী গেছেন।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রতিবছর লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন। করোনার প্রভাবে ২ বছর কমলেও ২০২২ সালে আবার এ সংখ্যা লাখ ছাড়ায়। এরপর থেকে আবার কমছে।

রামরু বলছে, প্রতিবছরেই প্রায় ১০ শতাংশ হারে প্রবাসী আয় বেড়েছে। গত বছর এসেছে ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ১২ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

এদিকে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, শ্রম অভিবাসনের এই ঊর্ধ্বগতি রেমিট্যান্স প্রবাহকে শক্তিশালী করেছে। গত বছরের প্রথম ১১ মাসেই দেশে ২৯.৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ-এর (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, সৌদি আরবগামী স্বল্প দক্ষ কর্মীদের বেতন এখনো অগ্রহণযোগ্যভাবে কম। বেতন কাঠামো এখনো ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমাদের কর্মীদের জন্য ভালো আয় নিশ্চিত করতে গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে মজুরি নিয়ে নতুন করে আলোচনায় সরকার এখনো সফল হতে পারেনি বলেন তিনি।

গন্তব্য হিসেবে সৌদি আরবের আধিপত্য

বিএমইটি’র পরিসংখ্যান অনুসারে ২০২৫ সালেও বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের প্রধান গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। মোট নিয়োগ পাওয়া কর্মীর দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি—৭ লাখ ৫০ হাজার ৯৬৭ জন কর্মী দেশটিতে গেছেন।

শীর্ষ পাঁচ গন্তব্যের তালিকায় সৌদি আরবের পরে রয়েছে কাতার (১ লাখ ৭ হাজার ৩৯৭ জন), সিঙ্গাপুর (৭০ হাজার ৪ জন), কুয়েত (৪২ হাজার ৬৫৭ জন) ও মালদ্বীপ (৩৯ হাজার ৯৭০ জন)। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গন্তব্য দেশের মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৩ হাজার ৬৯০ জন), জর্ডান (১২ হাজার ২২৯ জন), কম্বোডিয়া (১২ হাজার ১২৩ জন), ইতালি (৯ হাজার ২৯৭ জন) ও কিরগিজস্তান (৬ হাজার ৬৫০ জন)। যদিও বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে শ্রমিক পাঠানো প্রায় বন্ধ ছিল।

২০২৪ সালে সৌদি আরব একক দেশ হিসেবে এক বছরে রেকর্ড ৬ লাখ ২৮ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছিল। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির শ্রমবাজারের ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অতিনির্ভরশীলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, একক কোনো গন্তব্যের ওপর এমন নির্ভরশীলতা ওই দেশের নীতিগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—যদি কোনো কারণে সৌদি আরবের বাজার বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এর একটা বিপর্যয়কর প্রভাব পড়বে। এছাড়া আমরা ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মালয়েশিয়ার মতো অন্যান্য বড় বাজারগুলো এখনো পুনরায় খুলতে পারিনি।’

বিএমইটির তথ্যমতে, ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশগামী কর্মীদের ৪৩.৪৭ শতাংশ ছিলেন স্বল্প দক্ষ, ৩৪.৪৬ শতাংশ আধা-দক্ষ, ১৯.১৩ দক্ষ এবং মাত্র ২.৯৪ শতাংশ কর্মী ছিলেন পেশাদার ক্যাটাগরির। অর্থাৎ মোট কর্মীর ৭৭ শতাংশেরও বেশি স্বল্প দক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

২০২৪ সালেও একই চিত্র দেখা গিয়েছিল। সে বছর অভিবাসী কর্মীদের ৫৪.২৩ শতাংশ ছিলেন স্বল্প দক্ষ, যা আগের বছরের ৫০ শতাংশের চেয়ে বেশি। বিপরীতে, দক্ষ কর্মীর হার ২০২৩ সালের ২৪.৭৬ শতাংশ থেকে কিছুটা কমে ২০২৪ সালে ২৩.৬২ শতাংশ হয়েছিল। এছাড়া পেশাদার কর্মী ছিল ৪.৫৯ শতাংশ ও আধা-দক্ষ ছিল ১৭.৫৬ শতাংশ।

বেড়েছে নারী অভিবাসন হার

২০২৫ সালে নারী কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার হার কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালে প্রায় ৫৫ হাজার নারী কর্মী বিদেশে গেছেন; আর ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ৯৯৭ জনে। এই বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও তবে মোট অভিবাসী কর্মীর তুলনায় নারীদের সংখ্যা এখনো বেশ নগণ্য। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের অভাব, কাজের বৈচিত্র্যহীনতা ও গন্তব্য দেশগুলোর বিধিনিষেধের কারণে নারীরা এখনো পিছিয়ে আছেন।

বাংলাদেশ ২০২৩ সালে রেকর্ড ১৩.০৫ লাখ এবং ২০২২ সালে ১১.৩৫ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ জনশক্তি রফতানিকারক দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

সারাবাংলা/একে/এসআর
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর