ঢাকা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ভেঙে পড়ে পুরো পুলিশ প্রশাসন। ফলে ওই সময় পুলিশবিহীন দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়। এক পর্যায়ে পুলিশে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত থাকা কর্মকর্তারা হাল ধরেন বাহিনীটির। তারা পুলিশের মনোবল চাঙ্গা করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন, সেইসঙ্গে থানাগুলো সচল করার চেষ্টা করেন। এতে ধীরে ধীরে পুলিশ সক্রিয় হয়। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরাও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় এগিয়ে আসেন।
গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ দেন ময়নুল ইসলামকে। সেইসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান মাইনুল ইসলাম। এতেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল না। ফলে ওই বছরের নভেম্বরে আইজিপি হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বাহারুল আলম। একইসঙ্গে ডিএমপি কমিশনার হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান শেখ সাজ্জাত আলী।
পুলিশে সংস্কার প্রয়োজন- কর্মকর্তাদের এই দাবি ছিল দীর্ঘ দিনের। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি সংস্কার কাজেও হাত দেওয়া হয়। আর এর নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেন ড. আশরাফুর রহমান। ফলে দেড় বছরের মাথায় অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সেই ভেঙে পড়া পুলিশকে কাজে লাগিয়েই একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করেছে সরকার। কারণ, দেড় বছরে মোটামুটি সংস্কারসহ ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে সংস্থাটি। এর পেছনে ডিআইজি আশরাফুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার অবদান রয়েছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বর্তমান আইজিপিও চেয়েছিলেন, নিজের যেহেতু কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, তাই পুলিশে ব্যাপক সংস্কার হোক। তার আমলে ৬৪ জেলায় পুলিশ সুপার নিয়োগ হয়েছে কোনো ধরণের তদবির ছাড়া। অভিযোগ আছে, আগের আমলে একেকজন পুলিশ সুপার বদলি হতে কয়েক কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য হতো। তবে এবার সেটি হয়নি। এছাড়া অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং বদলিতেও কোনো ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠেনি।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হতেই পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) আইজিপি বাহারুল আলম পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন— এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে পুলিশ সদর দফতর জানিয়েছে, আইজিপি পদত্যাগ করেছেন এমন খবর ভিত্তিহীন। তিনি স্বপদেই বহাল রয়েছেন, এটি গুজব।
আইজিপির নিয়োগ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার শপথের পর নতুন আইজিপি নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। যেহেতু বর্তমান আইজিপি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে এসেছেন, সেহেতু তার নিয়োগ যেকোনো সময় বাতিল হতে পারে। তাই কয়েকদিনের জন্য নতুন আইজিপি নিয়োগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হননি।
সূত্র জানিয়েছে, নতুন আইজিপির তালিকায় রয়েছেন ১২ তম ব্যাচের দেলোয়ার হোসেন। তিনি বর্তমানে পুলিশের ট্রাফিক শাখার প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত আইজিপির দায়িত্ব পালন করছেন। তার পরেই রয়েছেন পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (ক্রাইম) ড. আশরাফুর রহমান। এ ছাড়া, ডিআইজি ড. নাজমুল করিম খান ও ডিআইজি আক্কাছ উদ্দিন ভুইয়ার নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে দেলোয়ার আর আশরাফের নাম-ই বেশি শোনা যাচ্ছে।
নতুন আইজিপি কে হচ্ছেন? তা সরকারের শপথ হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কে হচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করবে- এমনটাই শোনা যাচ্ছিল। সেই কাঙ্ক্ষিত শপথও হয়ে গেছে গতকাল (১৭ ফেব্রুয়ারি)। দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তাই এখন আইজিপি পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এর আগে এসব পদে বরাবরই নিয়োগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এবার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে আইজিপি নিয়োগের ক্ষমতা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে যাবে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ অবশ্যই থাকবে বলেও জানান অনেক কর্মকর্তা।
অন্যদিকে ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলীরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হওয়ায় এই পদেও শিগগিরই পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। চৌকশ কর্মকর্তা যারা আছেন তাদের মধ্য থেকে এই পদে খুব তাড়াতাড়ি নিয়োগ হবে বলে আশা করছে পুলিশ সদর দফতর। এক্ষেত্রে বর্তমান অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান নিয়োগ পেতে পারেন। তার পরেই আলোচনায় নাম রয়েছে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অ্যাডমিন) মো. সরওয়ার হোসেনের। এ ছাড়া, সরকার চাইলে ঢাকার বাইরে থেকে এনেও কাউকে ডিএমপি কমিশনার করা হতে পারে বলে জানা গেছে।