Sunday 05 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ফসলরক্ষা বাঁধই এখন ফসলের কাল
হাওরে পানিতে ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন

আল হাবিব, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০১ | আপডেট: ৫ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৫

বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে শত শত একর জমির কাঁচা ধান। ছবি: সংগৃহীত

সুনামগঞ্জ: হাওরের ফসল রক্ষার জন্য নির্মিত বাঁধ এখন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ ও পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে শত শত একর জমির কাঁচা ধান। কৃষকদের অভিযোগ, নদী থেকে পানি ঢোকা ঠেকাতে বাঁধ দেওয়া হলেও হাওরের ভেতরের বৃষ্টির পানি (ডুবরার পানি) বের হওয়ার কোনো পথ রাখা হয়নি। ফলে জলাবদ্ধতায় পচে যাচ্ছে ধান, যা নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে হাজারো কৃষকের।

শান্তিগঞ্জ উপজেলার দেখার হাওরের গুরুত্বপূর্ণ উথারিয়া ক্লোজার এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁধের উত্তর-পশ্চিম কোণের কয়েকশ মিটার দূরে এলাকাজুড়ে জমে রয়েছে বৃষ্টির পানি। দূর থেকে সবুজ ফসলের সমারোহ মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায় অধিকাংশ জমিই পানিতে অর্ধেক তলিয়ে আছে। সেগুলো যেন ছোট ছোট পানির জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। দেখার হাওরের পানি নিষ্কাশনের জন্য ক্লোজারের নিচে মাত্র তিনটি পাইপ বসানো হয়েছে। তিনটি পাইপ দিয়ে পানি নিষ্কাশন হলেও বিশাল এই হাওরের জন্য তা একেবারেই অপ্রতুল। কৃষকরা বলছেন, এই গতিতে পানি নামতে এক মাসেরও বেশি সময় লাগবে। অথচ, প্রতিদিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা বেড়েই চলছে।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, আস্তমা থেকে আসামপুর পর্যন্ত প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার এলাকায় সাতটি ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সরকার নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও অনেক বাঁধের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। কোথাও স্লোপ (ঢাল) ঠিক করা হয়নি, কোথাও টপের কাজ বা ঘাস লাগানো বাকি রয়েছে। এতে বাঁধের স্থায়ীত্ব নিয়ে যেমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তেমনি জলাবদ্ধতার কারণে ফসলহানির ঝুঁকিও বেড়েছে।

দেখার হাওরের উথারিয়া ক্লোজার এলাকা ছাড়াও হুগানি, গুরাডুবা, ডাউক্কা, আলমপুর, আব্দুল্লাহপুর, মেলানী কিত্তা, বিটগঞ্জ ও দড়িয়াবাজসহ বিভিন্ন এলাকার অর্ধেকের বেশি জমি বর্তমানে পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে জানান কৃষকরা। আস্তমা গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে বাঁধ দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শুধু পানি আটকে রাখার চিন্তা করা হয়েছে। হাওরের ভেতরে জমে থাকা বৃষ্টির পানি বের করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এখন এই জলাবদ্ধতায় আমাদের ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা খরচ না করে এখানে একটি স্লুইস গেট তৈরি করলে আর ক্লোজার ভাঙার ঝুঁকিও থাকবে না, বৃষ্টির পানিও বের হবে।’ এখন দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হলে বৈশাখে ফসল ঘরে তোলার কোনো আশা নেই বলেও জানান তিনি।

একই গ্রামের কৃষক মইনুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে ফসল বাঁচানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে বাঁধ কেটে দেওয়া। না হলে সব জমির ফসল পানির নিচে নষ্ট হয়ে যাবে।’ কৃষক হারিস আলী অভিযোগ করে সারাাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘বাঁধের উদ্দেশ্য ছিল হাওরের ফসল রক্ষা করা। কিন্তু, এখন সেই বাঁধই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর পানি ঠেকানোর ব্যবস্থা থাকলেও হাওরের ভেতরের জলাবদ্ধতা নিরসনের কোনো পথ রাখা হয়নি।’

কৃষক হেলাল মিয়া সারাবাংলাকে জানান, ‘বাঁধের অনেক কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। কোনো কোনো জায়গায় স্লোপ নেই, কোথাও কোথাও ঘাস লাগানো হয়নি। এখন হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নামলে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ এ বিষয়ে হাওর রক্ষা ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মো. ওবায়দুল হক মিলন সারাবাংলাকে বলেন, ‘অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে সুনামগঞ্জের অধিকাংশ হাওরেই এখন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এবার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ধান এরই মধ্যে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষকরা ধান ঘরে তুলতে পারবেন কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অথচ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু এলাকায় কৃষকরা নিজেদের ফসল বাঁচাতে বাঁধ কাটার চেষ্টা করছেন। কিন্তু, সেখানেও বাধা প্রশাসন। যদি কৃষকরা ফসল তুলতে না পারেন, তবে এর দায়ভার পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনকেই নিতে হবে।’ তবে জেলা ইভেন্টসংশ্লিষ্ট পিআইসি কর্তৃপক্ষ বলছে ভিন্ন কথা। ৬৩ নম্বর উথারিয়া ক্লোজার পিআইসির সাধারণ সম্পাদক আঙ্গুর মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের বাঁধের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বৃষ্টির কারণে কিছু স্থানে গর্ত হয়েছে, সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে। এছাড়া ঘাস লাগানোর কাজও চলমান রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাঁধ কেটে দিলে উপকারের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। কারণ, মেঘালয় অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত হলে হঠাৎ বন্যা দেখা দিতে পারে। তখন নতুন করে বাঁধ মেরামতের সুযোগ থাকবে না, কারণ বাঁধের জন্য আনা মাটিও এখন পানির নিচে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার সারাবাংলাকে বলেন, ‘অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে, কৃষকরা নিজেদের জমির জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বাঁধ কাটার চিন্তা করছেন। কোথাও কোথাও তারা জোরপূর্বক ফসল রক্ষার উদ্দেশ্যে এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেনও। তবে আমরা সবসময় তাদের এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ জানাই। কারণ, এই মুহূর্তে বাঁধ কাটা হলে যেকোনো সময় নদীর পানি ঢুকে বড়ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্লুইচগেটের সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলো যদি সচল করা যায়, তাহলে হয়তো এই জলাবদ্ধতা নিরসন হবে। এ ছাড়া, যেসব স্থানে রেগুলেটর নেই, সেখানে পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। এবং এসব পাইপের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন কার্যক্রম চালু রয়েছে।’ চলতি বছরে তুলনামূলক নিয়মিত বৃষ্টিপাত হওয়ায় হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় কিছু কিছু স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর