ঢাকা: ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে গোটা বিশ্বে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল নিয়ে অস্থিরতার মধ্যেই গত ২ এপ্রিল হঠাৎ করেই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। ভোক্তা পর্যায়ে সিলিন্ডারের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। কিন্তু বাস্তবে বাজারে সেই দামেও মিলছে না গ্যাস। এতে বিপাকে পড়েছে রাজধানীবাসী। বিশেষ করে বড় যেসব ভবনে সরাসরি লাইনের গ্যাস নেই তারা বিপদে পড়েছে সবচেয়ে বেশি। গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আকাশচুম্বী হলেও প্রয়োজনের তাগিদেই কিনে নিতে হচ্ছে তাদের।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম বেশি হলেও কেনা যাবে; কিন্তু সরবরাহ না থাকলে কেনা বন্ধ হয়ে যাবে। সে দিকেই যাচ্ছে দেশের অবস্থা। কারণ, কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের এলএনজি কাতার থেকেই আসতো। সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই সামনে যেকোনো সময় সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন বেশি দামেও গ্যাস পাওয়া সম্ভব হবে না।
সম্প্রতি ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করেন এমন বেশিরভাগ দোকানে সিলিন্ডার নেই। যে দুয়েকটি দোকানে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও প্রায় দ্বিগুণ দাম নেওয়া হচ্ছে। ক্রেতারাও দাম বেশি নেওয়ার বিষয়টি অভিযোগ করেছেন। তবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, করার কিছুই নেই। কারণ, তারাও অনেক বেশি দামে এলপিজি কিনে আনছেন।
রোববার (৫ এপ্রিল) রাজধানীর মিরপুর ৬০ ফুট সড়কে মনির গ্যাস স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতাদের সঙ্গে তর্ক হচ্ছে তার। জানতে চাইলে মনির হোসেন সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সরকারি রেট ১ হাজার ৭২৮ টাকা হলেও বাস্তবে কোম্পানি থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। পরিবহণ ও শ্রমিক খরচ যাচ্ছে আরও ১০০ টাকা। গ্রাহকের বাসায় পৌঁছাতে লাগে আরও ৫০ টাকা। লাভ থাকে ১০০ টাকা।’ বরং, আরও বেশি দামে বিক্রি করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে শনিবার (৪ এপ্রিল) রাজধানীর বড় মগবাজার এলাকার ফারিয়া স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, একেকটি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ২৫০০ টাকায়। ক্রেতা কোনোভাবেই ২৫০০ টাকা দেবেন না আর বিক্রেতা কোনোভাবেই ছাড়বেন না। শেষে ৫০ টাকা ফেরত দেন দোকানদার। তিনি বলেন, ‘এটা আপনাকে জাস্ট সম্মান করলাম।’
ক্রেতা আলাউদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘২৫০০ টাকার গ্যাস কিনে দিন চলবে কেমনে বুঝতেছি না। মনে হয় না খেয়ে থাকতে হবে। অথচ ঢাকা থেকে গ্রামে পাঠাতে হবে সবকিছু। এভাবে তো দিন চলতে পারে না। সরকার বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।’ না হলে দেশের সবকিছু থমকে যেতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সোমবার (৬ এপ্রিল) সাইন্সল্যাব ইস্কাটন এলাকার গলিতে আলী ট্রেডার্স নামে দোকানে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ টাকা। তবে যার তার কাছে গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করেন না। শুধুমাত্র পরিচিতজনদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করেন। দাম বেশি নিলেও পরিচিতরা কিছু বলেন না বলে জানান তিনি। দাম বেশির কারণ জানতে চাইলে দোকানদার রবিউল হাসান সারাবাংলাকে বলেন, ‘বেশি দামে কিনি, তাই বেশি দামে বেচি। এ ছাড়া, আর কোনো কারণ নেই।’
এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বলছে, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি যৌক্তিক ছিল। এতে বাজারে সরবরাহ ঠিক আছে। এটি না করলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতো একটি চক্র। এলএনজি কাতার থেকে আমদানি বন্ধ রয়েছে। বিকল্প দেশ খোঁজা হচ্ছে।
জানা গেছে, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে দেশটির দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় সরকার স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস কেনার বিকল্প উৎস খুঁজছে। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশ থেকে এলএনজি আমদানির চেষ্টা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সবুজ সংকেত মেলেনি।
বিইআরসি’র ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাড়তি দামে এলএনজি এলে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে ১২ কেজির সিলিন্ডার দুই হাজার টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর সরকারিভাবে ২০০০ টাকা হলে ভোক্তা পর্যায়ে সেটি তিন হাজার টাকাও ছাড়াতে পারে।’ তবে দাম বেশি দামে হলেও মানুষ চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সিলিন্ডার চান বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২ এপ্রিল সবশেষ গ্যাসের দাম ৩৭৮ টাকা বাড়ানোর আগে গত ২ মার্চ সবশেষ সমন্বয় করা হয় এলপি গ্যাসের দাম। সে সময় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল। এছাড়াও ভোক্তা পর্যায়ে ৩ পয়সা কমিয়ে অটোগ্যাসের মূসকসহ দাম প্রতিলিটার ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।