ঢাকা: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পুরান ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারক নিয়ে স্ব-মহিমায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। যদিও প্রাচীন আমলে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় ২০০৫ সালে। কিন্তু রূপান্তরের দুই দশক পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত ছিল না কোনো ছাত্রসংসদ। এবার সেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন (জকসু)। এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গত ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারিত দিনে ভোট স্থগিত করা হয়। পরে নতুন করে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেই তারিখ অনুযায়ী মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট দেবেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
জগন্নাথ কলেজ থাকাকালীন সর্বশেষ ১৯৮৭ সালে ছাত্রসংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কলেজ থেকে ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর এবারই প্রথম কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যা জবি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ৬ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৩৯ কেন্দ্রের ১৭৮টি বুথে হবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এরই মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রগুলোর জন্য ব্যালট বাক্স, ব্যালট পেপার, গোপন ভোটকক্ষ, ভোটার তালিকাসহ প্রয়োজনীয় সব নির্বাচন সামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারসহ পর্যাপ্ত সংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আজ সারাদিন কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা তদারকিতে বিশেষ নজরদারি চালানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ক্যাম্পাসজুড়ে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রক্টরিয়াল বডির পাশাপাশি পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
জকসু নির্বাচনে মোট ভোটার ১৬ হাজার ৪৪৫ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৮ হাজার ৪৭৯ জন এবং ছাত্র ৮ হাজার ১৭০ জন। কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট প্রার্থী ১৮৭ জন। ভোট দিতে আসা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে অবশ্যই বৈধ শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখতে হবে। পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ভোট দিতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে মোবাইল ফোন, স্মার্ট ডিভাইস কিংবা ক্যামেরা বহন ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব নির্দেশনা অমান্য করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে নির্বাচন কমিশন।
এছাড়া ভোটগ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে মিছিল, স্লোগান, পোস্টার প্রদর্শন বা যেকোনো ধরনের প্রচার নিষিদ্ধ থাকবে। নির্বাচন আচরণবিধি অনুযায়ী, ভোটের দিন সব রাজনৈতিক ব্যানার, ফেস্টুন ও প্রচার সামগ্রী অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রার্থিতা বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে কমিশন জানিয়েছে।
শেষ সময়ের প্রচারণা ও শিক্ষার্থীদের সাড়া প্রসঙ্গে ছাত্রদল সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নির্ভীক জবিয়ান প্যানেলের জিএস পদপ্রার্থী খাদিজাতুল কোবরা বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে। সামগ্রিকভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে খুবই ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। এখন আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা একটি সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচন।’
ছাত্রশিবির সমর্থিত অদম্য জবিয়ান ঐক্য প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘শুরু থেকেই আমাদের প্রচার জোরদার ছিল। নিয়মিত ক্যাম্পাসে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাদের সমস্যা শুনেছি। নির্বাচন নিয়ে তাদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ্য করেছি।’
অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট সমর্থিত মওলানা ভাসানী ব্রিগেড প্যানেলের এজিএস পদপ্রার্থী শামসুল আলম মারুফ বলেন, ‘প্রচারের জন্য আমরা খুব অল্প সময় পেয়েছি। তবুও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া মিলেছে। তবে নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ হবে, সে বিষয়ে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে। আমরা চাই ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন।’
নির্বাচন বিষয়ে সিন্ডিকেট সভা শেষে মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন বলেন, ‘আগামীকাল জকসু নির্বাচন আয়োজনে সিন্ডিকেট চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের প্রতিনিধিসহ সকল সদস্য নির্বাচন আয়োজনে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন।’
তিনি আরও জানান, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ক্যাম্পাস ও আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাহাদুর শাহ পার্কে পুলিশের একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে।
নির্বাচন সুশৃঙ্খল ভাবে সম্পন্ন করতে প্রস্তুত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোরিয়াল বডির। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড তাজাম্মুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। আশা করি সুন্দরভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘জকসু নির্বাচন জবি শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি।’ তিনি সকল শিক্ষার্থীকে দায়িত্বশীল আচরণ ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান।
অপরদিকে শেষ দিনের প্রচার শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ ও কৌশল নির্ধারণ। ভোটারদের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের যোগাযোগ ও এজেন্ট তালিকা চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে জকসু নির্বাচন নিয়ে আলোচনা, বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত ৩০ ডিসেম্বর জকসু নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জরুরি সিন্ডিকেট সভার মাধ্যমে জকসু নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুনরায় ৬ জানুয়ারি জকসু নির্বাচনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়।