ঢাকা: বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর চাইলে অবশ্যই গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পরিবেশ থাকতে হবে। আর সেক্ষেত্রে অবশ্যই সত্যিকারের মত প্রকাশের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা জরুরি। বিগত বছরগুলোতে গণমাধ্যম বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রিত ও নিপীড়িত হলেও চব্বিশের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণ নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়। এই নতুন বাংলাদেশে উগ্রবাদ মোকাবিলা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর শেরাটন হোটেলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও গণমাধ্যমের প্রধানদের এমন পরামর্শ উঠে আসে। মঞ্চে তারেক রহমান অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা শোনেন ও নিজে নোটও করেন। এ সময় তার পাশে বসা ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান জানতেন না যে, তিনি কত পপুলার। তার জানাজায় অবিস্মরণীয় লোক হয়েছিল তখন। কিছুদিন আগে আমরা দেখলাম ম্যাডাম খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ। সারা বাংলাদেশ হয়ে গেল জানাজার ক্ষেত্র। এটাও একটা অভূতপূর্ব ঘটনা।’
তিনি আরও বলেন, ‘তারেক জানেন না তিনি আসলেই কত জনপ্রিয়। আমি যখন জেলে গেলাম, তখন জেলবন্দিরা তার কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করতো। সবচেয়ে বড় কথা, পুলিশরাই জিজ্ঞাসা করতো। যারা আমার রক্ষক তারাই জিজ্ঞাসা করতো- উনি কেমন আছেন? আমি বলতাম উনি তো লন্ডনে, বহু দূরে আছেন। আর, আমি আপনাদের এখানে আছি। এতটাই শ্রদ্ধা করেন তারেক রহমানকে।’ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর নিড়ীড়ন-নির্যাতন ও কারাগারে স্বজনদের সাক্ষাৎবঞ্চিত করা এবং সুচিকিৎসা না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে সরকারের নীতির ক্ষোভ প্রকাশ করেন শফিক রেহমান।
দেশ গড়ার পরিকল্পনায় শুভ কামনা জানিয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, ‘১৭ বছর পর আপনি একটি স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন, একটা পরিকল্পনার কথা বলেছেন। আমি শুধু বলতে চাই, আপনার সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক, পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন হোক।’
ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্যে আগামীর চ্যালেঞ্জেগুলো কী? আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- ক্লাইমেট চেঞ্জ। এটা নিয়ে আমরা কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর অত আলোচনা করছি না। ক্লাইমেট চেঞ্জের যে কী ইমপ্যাক্ট হবে এটা অলরেডি আমরা কোস্টাল বেল্টে দেখতে পাচ্ছি। সো আমার অনুরোধ থাকবে, ক্লাইমেট চেঞ্জ ইউর ভেরি ইম্পর্টেন্ট প্রায়োরিটি। আরেকটা হচ্ছে আমাদের পানি সম্পদ। আমরা পৃথিবীর অন্যতম সম্পদশীল দেশ পানির ক্ষেত্রে। কিন্তু আমরা সমস্ত নদীকে দূষণ করছি। ইট ইজ কোয়াট ইনক্রিডেবল যে, আমরা কিভাবে নদী দূষণের দিকে যাচ্ছি এবং কিছুই করছি না।’
তারেক রহমান এখন আমূল পরিবর্তন হয়েছেন জানিয়ে মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘আমি এক তারেক রহমানকে চিনতাম ২৩ বছর আগে। আমি প্রথম ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এখন দেখি ২৩ বছর বাদে তারেক রহমান বদলে গেছেন। আমুল পরিবর্তন হয়ে গেছে তার মধ্যে। অনেকে এটা বিশ্বাস করেন না। আমি কাছে থেকে জানি, দেখি শুনেছি। আমরা লিখতে চাই, আমরা বলতে চাই। মিডিয়া ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর অনেকটাই স্বাধীন, অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রিত এই কারণে বলছি, মব ভায়োলেন্সের কারণে আমরা অনেকটাই সাহসী হতে পারছি না। আমাদের হাত-পা বাধা হয়ে যাচ্ছে।’
আমার দেশ এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ফ্যাসিস্ট আমলে নির্যাতিত সাংবাদিকদের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘ভুয়া মামলায় ক্যানসার আক্রান্ত গাজী ভাইকে জেলখানায় রেখে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, আমাদের ম্যাডামের (বেগম খালেদা জিয়া) মতো। দুর্ভাগ্যের বিষয় হল আজকে যারা মিডিয়ার এখানে বসে আছেন তারা কেউ গাজী ভাইয়ের জন্য টু শব্দ উচ্চারণ করেন নাই। এটাই বাস্তবতা। আসাদ ভাইকে (আবুল আসাদ), আমাদের মধ্যে প্রবীণতম সম্পাদক, তাকে ছাত্রলীগের গুন্ডারা অফিসে ঢুকে দাড়ি ধরে নামিয়ে পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছে। বছরের পর বছর তিনি জেলে থেকেছেন তিনিও অসুস্থ। তার স্ত্রী মারা গেছেন। তিনি তার স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেন নাই। কারণ জেল থেকে বেরনোর পরেও তাকে পালিয়ে পালিয়ে থাকতে হয়েছে। আসাদ ভাইয়ের জন্যে কোনো এলিট সম্পাদক আওয়াজ তোলেন নাই।’
তিনি বলেন, ‘আমি জনাব তারেক রহমানকে একটা ছোট্ট পরামর্শ দিয়েই বক্তব্য শেষ করব। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলেন না। তিনি জানতেন না মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে হয়েছে এবং তিনি ফিরে এসেও জানার চেষ্টা করেন নাই মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে হয়েছে। তাকে আওয়ামী লীগের লোকজন যা বলেছে এবং ভারতীয় পক্ষ যা বলেছে সেটাকেই তিনি ধরে নিয়েছিলেন- এটাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছিল। এইজন্যই তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। জনাব তারেক রহমান আপনি ১৭ বছর দেশে ছিলেন না। আপনি জানেন না, এখানে কী হয়েছে। আপনার বিশিষ্ট লোকজন আপনাকে যা বলেছে, এটাই আপনি শুনেছেন। এখন যারা মিডিয়ার নতুন বন্ধুরা আপনাকে যেটা বলছে সেটাই আপনি শুনছেন এবং সেটাই আপনি মনে করছেন এটাই বাংলাদেশের ১৭ বছরের ইতিহাস। এটা ১৭ বছরের ইতিহাস না। সেই ইতিহাস আমি বর্ণনা করব, ভবিষ্যতে যদি আপনি এরকম কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন এবং সেই অনুষ্ঠানে আমাকে ১৫ মিনিট সময় দেন।’
নিউএজের সম্পাদক ও এডিটরস কাউন্সিলের সভাপতি নুরুল কবীর বলেন, ‘আমরা যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর চাই অবশ্যই গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পরিবেশ থাকতে হবে। কী কী পদ্ধতিতে গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার আবহাওয়া নষ্ট হয় সেগুলো আলোচনার জন্য সেমিনার করা যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বহু সংবাদকর্মীর ওপর, বহু সাংবাদিকের ওপর নানাভাবে মামলা-হামলা ও অন্যায় হয়েছে। সেইসব মামলার আইনগতভাবে লড়াই করবার পরিবেশটা উপস্থিত ছিল না। গত রেজিমের সঙ্গে যারা সমর্থক ছিলেন তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এই মুহূর্তে জেলে আছেন। শেখ হাসিনার আমলের ওইগুলো যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে যারা জেলে আছেন যদি আইনগতভাবে তাদের মামলা লড়ার সুযোগ না দেওয়া হয় সেটাও অন্যায়।’
কালের কণ্ঠের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে, গোয়েন্দাশাসিত মিডিয়া। আমরা দেখেছি যে, একটা রিক্রুটমেন্টের ক্ষেত্রেও গোয়েন্দাদের ডিক্টেশন আমাদের বাধ্য হয়ে হজম করতে হয়েছে। সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না। আমরা সত্যিকারের মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই- যেটা শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময় আমরা পেয়েছি।’
অনুষ্ঠানে দৈনিক ইনকিলাবের এএমএম বাহাউদ্দিন, যুগাস্তরের আবদুল হাই শিকদার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মমতাজ বিলকিস, ঢাকা স্টিমের সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ, নাগরিক টিভির এরফানুল হক নাহিদ, দেশ রূপান্তরের রেজাউল করীম লাভলু, শাহনাজ বেগম পলি, ইউএনবির আবদুর রহমান জাহাঙ্গীর, ইত্তেফাকের সাইদুর রহমান, নিউজ টোয়েন্টিফোরের মারুফা রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন।
তার আগে তারেক রহমান অনুষ্ঠানস্থলে এসে আসনে আসনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে করমর্দন ও কুশল বিনিময় করেন। কক্ষের একেবারে পেছনের সারিতে আলোকচিত্র সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে তাদের সঙ্গে হাত মেলান তিনি। এর পর তিনি মঞ্চে ওঠার সময়ে দেখেন লাল ফিতে দিয়ে একটা বেষ্টনী করা হয়েছে। তারেক রহমান এই বেষ্টনী সরিয়ে নিতে বললে তা সঙ্গে সঙ্গে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সঞ্চালক জানান, আমরা একটা নিরাপত্তা বেষ্টনী এখানে তৈরি করেছিলাম। সেই বেষ্টনীটি তিনি উঠিয়ে দিতে বলেছেন। কারণ, তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে এই দূরত্ব চান না।