Monday 02 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রংপুর-৫ আসন
জামায়াতের শক্ত দুর্গে বিএনপির চোখ, ‘ফ্যাক্টর’ আওয়ামী ভোট

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৩৮

রংপুর-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী গোলাম রব্বানী ও বিএনপির প্রার্থী আরেক গোলাম রব্বানী। ছবি: সারাবাংলা

রংপুর: আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচন নিয়ে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও জাতীয়পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। যদিও গতবছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচনে আসতে পারছে না আওয়ামী লীগ (সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। সেক্ষেত্রে বেশিরভাগ জায়গায় বিএনপির শক্ত প্রতিপক্ষ হওয়ার চেষ্টা করছে জামায়াত, এনসিপি ও জাতীয় পার্টি। এই দল তিনটি তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে শক্ত অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে।

বর্তমানে সারাদেশে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ ক্ষেত্রে থেমে নেই উত্তরের জেলা রংপুরও। তিস্তা তীরের এই অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবনের লয় চলে স্বপ্ন আর সংগ্রামে। ভোটের হাওয়া এবার সেই লয়ে এক নতুন ছন্দ এনে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের ছায়া থেকে বেরিয়ে নতুন বন্দোবস্ত ও গণতন্ত্র রক্ষার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠছে এখানে।

বিজ্ঞাপন

জেলার হাট-বাজার, ধানখেত, দোকানগুলোতে গল্প-আড্ডায় এখন শুধুই প্রসঙ্গ আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মিছিল-মিটিং, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য প্রমাণে উঠে-পড়ে লেগেছেন তারা। তবে একসময়ের প্রচলিত বাণী ‘রংপুরের মাটি, জাতীয় পার্টির ঘাঁটি’ এবং ‘রংপুরের রাজনীতিতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদই যে শেষ কথা’- বাস্তবে এখন আর এমন নেই। আগে রংপুর জেলার সবক’টি আসনই জাতীয় পার্টির দখলে থাকতো। কিন্তু এখন পালটে গেছে সেই চিত্র।

এর আগে ভোটারবিহীন ও ভোট কারচুপি করে টানা মেয়াদে থাকা আওয়ামী লীগ দখলে নেয় জেলার চারটি আসন। আর আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী হওয়ায় দু’টি আসন ধরে রাখতে পারে জাপা। তবে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর এখন রংপুরের রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পালটে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে। এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতে রংপুর থেকে আসন বের করা জাপার জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, এখানকার আসনগুলোতে এবার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির শক্ত প্রার্থী রয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আসনভিত্তিক পরিক্রমায় এবার সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে সারাবাংলার আয়োজনে থাকছে রংপুর-৫ (মিঠাপুকুর) আসন। বর্তমানে এই এলাকা যেন এক রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে। যেখানে দীর্ঘদিনের জাতীয় পার্টির আধিপত্য ভেঙে পড়ছে, আর উঠে আসছে পরিবর্তনের অটুট প্রত্যয়। এবার রংপুর-৫ আসনের মানুষ তাদের ভোটার সত্ত্বাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগাম ঘোষণায় ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত মিঠাপুকুর উপজেলার (রংপুর-৫ আসন) এই এলাকা যেন এক রাজনৈতিক ক্যানভাসে পরিণত হয়েছে। যেখানে দীর্ঘদিনের আধিপত্যের ছায়া মিলিয়ে যাচ্ছে, আর উঠে আসছে নতুন নেতৃত্বের প্রত্যয়। একসময়ের জাতীয় পার্টির দুর্গখ্যাত এই আসন এখন রাজনৈতিক উত্তাপে উত্তাল। স্বাধীনতার পর অধিকাংশ সময় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দখলে থাকলেও বিএনপি মাত্র একবার জয়ী হতে পেরেছে এই আসনে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতের শক্তি, বিএনপির পুনরুত্থানের আশা এই আসন এখন সমীকরণের রণক্ষেত্র।

আসনের ভোটের ইতিহাস যেন এক দীর্ঘ যাত্রার কাহিনী। স্বাধীনতার পর অধিকাংশ সময় এই আসন আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির দখলে ছিল, বিএনপি থেকে মাত্র একবার জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের মতিউর রহমান, ১৯৭৯-এ বিএনপির খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল, ১৯৮৬-এ আওয়ামী লীগের এইচ এন আশিকুর রহমান, ১৯৮৮-এ জাতীয় পার্টির হারিজ উদ্দিন সরকার, ১৯৯১-এ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (উপ-নির্বাচনে মিজানুর রহমান চৌধুরী), ১৯৯৬-এ এরশাদ (উপ-নির্বাচনে আশিকুর রহমান), ২০০১-এ জাতীয় পার্টির শাহ সোলায়মান আলম ফকির, ২০০৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আশিকুর রহমান, এবং ২০২৪-এ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী জাকির হোসেন সরকার জয়ী হন। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের আশিকুর রহমান ২ লাখেরও বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন, যখন বিএনপির শাহ সোলায়মান আলম ফকির ৬৪ হাজারের কাছাকাছি ভোট পান এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী ১২ হাজারের কাছাকাছি। এই ইতিহাস দেখায়, জাতীয় পার্টির দুর্গখ্যাত এই আসন কৌশলে আওয়ামী লীগের দখলে চলে যায়, শেষ চার মেয়াদে তারা বা তাদের বিদ্রোহী প্রার্থীদের আধিপত্য।

এই আসনে দলগুলোর প্রভাব এখন পরিবর্তনের মোড়ে। আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির শূন্যতায় জামায়াতের উত্থান ঘটছে, ২০১৪ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনের সময় জামায়াত-শিবিরের তৎপরতায় মিঠাপুকুর আলোচিত হয়। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদে জামায়াতের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। তবে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে জয়ী জামায়াত নেতা গোলাম রব্বানী শপথ নিতে গিয়ে গ্রেফতার হন এবং শেষ পর্যন্ত চেয়ারে বসতে পারেননি। সর্বশেষ ২০২১-২২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জামায়াত সাত ইউনিয়নে জয়লাভ করে।

এদিকে বিএনপির প্রভাবও শক্তিশালী, যদিও তারা জোটগতভাবে লড়াই করেছে। গত বছরের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জামায়াত এককভাবে প্রস্তুতি নিয়েছে যখন বিএনপি হারানো আসন পুনরুদ্ধারের আশায়। ইসলামী আন্দোলনেরও প্রভাব আছে।

এই আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বক্তব্যে ফুটে উঠছে আশা এবং প্রত্যয়। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী রংপুর জেলার আমির গোলাম রব্বানী। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘আগে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে জয় পেলেও আওয়ামী লীগ সরকারের নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েছি। তারা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আমাকে আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। কিন্তু ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পাবে। সুষ্ঠু নির্বাচনে জামায়াত ব্যাপক ভোটে জয়ী হবে ইনশাআল্লাহ।’

সেই তুলনায় এই আসনে নতুন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। মনোনয়ন পেয়েছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম রব্বানী। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে এই আসন দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার ও তার দোসরদের দখলে ছিল। বিএনপির পক্ষে এখানে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর ধানের শীষ থেকে এখানে প্রার্থী হয়েছে। দলের সাংগঠনিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো। আমার ১৭টি ইউনিয়ান নিয়ে গঠিত মিঠাপুর উপজেলা আমার উপজেলায় কোনো দলের নেতাকর্মীর সঙ্গে আমার মতপার্থক্য নেই। তারা দিনরাত আমার সঙ্গে ধানের শীষের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।’

এ ছাড়া, একসময় ‘লাঙ্গলের ঘাঁটি’ হিসেবে খ্যাত রংপুরের হারানো এই আসন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে জাতীয় পার্টি এস এম ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এবি পার্টি থেকে এ আসনে জেলা আহ্বায়ক আবুল বাছেত মার্জান ও বাম জোট থেকে বাসদের জেলা কমিটির সদস্যসচিব মমিনুল ইসলাম প্রার্থী হয়েছেন।

এদিকে সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়ায় মিশে আছে অনিশ্চয়তা এবং আশা। পায়রাবন্দ ইউনিয়নের ভোটার আমিনুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘জামায়াতের শক্ত অবস্থান আছে, কিন্তু বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টিরও ভোট রয়েছে। আওয়ামী লীগ যেহেতু অংশ নিচ্ছে না, সেহেতু তাদের সমর্থকরা কোন দিকে যাবেন সেটা দেখার বিষয়। এবার আলাদা লড়াই হলে ভোটও আলাদা হয়ে যাবে।’

শঠিবাড়ী ইউনিয়নের ভোটার মিলন ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এতদিন এ আসনের বিভিন্ন নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত জোটগতভাবে অংশ নিয়েছে। এবার আলাদাভাবে নির্বাচন করছে তাহলে তাদের ভোটও আলাদা হয়ে যাবে।’

নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক হারুন অর রশীদ চৌধুরীর মতে, ‘রংপুর-৫ আসনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি জটিল চিত্র; যেখানে জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি, বিএনপির ঐতিহ্যবাহী ভোট ব্যাংক সবই একসাথে কাজ করে। নতুন ভোটারদের মনোভাব এবং দলগুলোর মধ্যে ভোট বিভাজনই এই আসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।’ স্থানীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও কৃষি উন্নয়নই এই অঞ্চলের ভোটারদের প্রধান আকর্ষণ হবে বলে বলে মনের করেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত নির্বাচনে এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৪০ হাজার ৩৩৫ জন। এর মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ছিলেন ৪ জন। কেন্দ্র ছিল ১৫০টি। এবার এই আসনে ভোটার সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ১৮৯ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭২৩ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৩২ হাজার ৪৬২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন। ভোটার বেড়েছে ২৮ হাজার ৮৫৪ জন। আর দুটি কেন্দ্র বেড়ে হয়েছে ১৫২টি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর