কুষ্টিয়া: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক জাগরণ সবক্ষেত্রেই কুষ্টিয়ার অবদান অনন্য। তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) ১৯৭১ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়া ছিল দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চলগুলোর একটি। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ কুষ্টিয়ায় শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। যদিও বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলটি এখানকার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। তবে ২০০৮ সালের পর থেকে আওয়ামী লীগ ফের জেলার সব আসন দখলে নেয়।
সাংস্কৃতিক রাজধানীখ্যাত কুষ্টিয়া বাউল সম্রাট লালন ফকির, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ, সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন, কাঙাল হরিনাথ ও বিপ্লবী বাঘা যতীনের জন্মভূমি হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিত। আশির দশকে কুষ্টিয়া ছিল চরমপন্থী রাজনীতির কেন্দ্র। তবে, আজও এই জেলা তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক মানচিত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
কুষ্টিয়া-১ গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাধীনতার পর থেকে এ আসনটিতে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জয়লাভের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজিজুর রহমান আক্কাস সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী আহম্মদ আলী জয়লাভ করেন। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ কোরবান আলী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ১৯৯১ সাল থেকে পর পর ৪ চার বার বিএনপি থেকে আহসানুল হক মোল্লা (পচা মোল্লা) জয়লাভ করেন।
আহসানুল হক মোল্লার মৃত্যুর পর ২০০৪ সালের উপ-নির্বাচনে তার ছেলে বাচ্চু মোল্লা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী আফাজ উদ্দিন আহমেদ জয়ী হন। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রেজাউল হক চৌধুরী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সরওয়ার জাহান বাদশা এ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল হক চৌধুরী নির্বাচিত হন। এই আসনের নির্বাচনি ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের রায় ও রাজনৈতিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে, যা আসনটিকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এই আসন থেকে নির্বাচন করবেন সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা। কিন্তু এই আসনে বিএনপি মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছিল ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফ উদ্দিন জুয়েলের কর্মী-সমর্থকরা। এ ছাড়া, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করবেন দৌলতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি মাঠে থাকছেন মাওলানা বেলাল উদ্দিন। একই সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন মুফতি আমিনুল ইসলাম। এ ছাড়া, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী নুসরাত তাবাচ্ছুম নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও দলীয়ভাবে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। পরে এক ফেসবুক পোস্টে দলের নির্বাচনি সব কার্যক্রম থেকে নিজেকে নিষ্ক্রিয় রাখার ঘোষণা দেন তিনি। এছাড়া, জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এর শাহরিয়ার জামিল জুয়েল, গণঅধিকার পরিষদের সাহাবুল ইসলাম, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের বদিরুজ্জামান ও জেএসডির গিয়াস উদ্দিন মাঠে থাকছেন।
তবে গত কয়েকটি নির্বাচনে রেস সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো রয়েছে। এই জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সহনশীলতা দেখাতে হবে। যেন জনগণ নিজের পছন্দের প্রতীকে ভোট দিতে পারে এমন মন্তব্য করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। কলেজ ছাত্র নিকাশ আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবার নির্বাচনে এমন কাউকে আমারা চাই, যিনি তরুণদের নিয়ে ভাববেন। সেইসঙ্গে আমাদের ভোট দেওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ দিতেও হবে; যাতে আমাদের পছন্দ মত প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারি।’
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের বিএনপির প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাকে দল থেকে মূল্যায়ন করা হয়েছে, আমিও এর প্রতিদান দেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘দৌলতপুরে বিএনপির মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। নির্বাচিত হলে বিশেষ করে তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব।’ বাচ্চু মোল্লা দাবি করেন, নেতাকর্মী থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই তার পাশে আছে।
অপরদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী মাওলানা বেলাল উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ এবার জামায়াতকেই দেখতে চায়, কারণ তারা অন্যান্য দলের ওপর আস্থা হারিয়েছে। চাঁদাবাজি, ডাকাতি ও বিভিন্ন অপরাধ দমনে জামায়াত কাজ করছে এবং করবে। পাশাপাশি কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হবে।’
উল্লেখ্য, জেলা নির্বাচন অফিসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী কুষ্টিয়া-১(দৌলতপুর) আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৪লাখ ৪ হাজার ৪৭১ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ১ হাজার ৩ জন। এবং পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৩ হাজার ৪৬৭ জন।