ঢাকা: ঢাকা-১৭ আসন। গুলশানের অভিজাত অট্টালিকার কাচের দেয়াল থেকে কড়াইল বস্তির টিনের চাল। সেইসঙ্গে আছে ক্যান্টনমেন্টের নিরাপত্তা বলয়ে ঢাকা মাটিকাটা, মানিকদী ও নামাপাড়া এলাকা। এই তিন বিপরীত মেরুর মেলবন্ধনে গড়া বিচিত্র এক জনপদ। তবে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটি কেবল ভৌগোলিক গুরুত্বে নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই এখানে ‘ধানের শীষ’ নিয়ে ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন। আর তাই গুলশান-বনানীর মসৃণ রাস্তা থেকে ভাষানটেক বা মহাখালী করাইলের সরু গলি, সেইসঙ্গে সুশৃঙ্খল সবুজেঘেরা ক্যান্টনমেন্টের আবাসিক এলাকা। সবখানেই এখন একটাই প্রশ্ন— ভোটের লড়াই কতটা জমবে?
তারেক রহমান: প্রতীক থেকে ক্ষমতার লড়াই
তারেক রহমানের প্রার্থী হওয়া নিছক একটি আসনে মনোনয়ন দেওয়া নয়; এটি বিএনপির পক্ষ থেকে সরাসরি ক্ষমতার দাবির ঘোষণা। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থেকেও দলীয় কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন প্রতীক। কিন্তু ঢাকা-১৭-তে সরাসরি মাঠে নামার মাধ্যমে তিনি সেই প্রতীকী অবস্থানকে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তারেক রহমানের প্রচারে সবচেয়ে বড় শক্তি তার সরাসরি উপস্থিতি ও আবেগী সংযোগ। ভাষানটেকের জনসভায় মঞ্চে পোশাককর্মী, রিকশাচালক কিংবা শিক্ষার্থীকে ডেকে নেওয়া। এটি কেবল জনসংযোগ নয়, এটি একটি বার্তা— ‘আমি আপনাদের কথা শুনছি।’ বস্তিবাসীদের জন্য পুনর্বাসন, ফ্ল্যাট নির্মাণ, ফ্যামিলি কার্ড— এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নযোগ্য হোক বা না হোক, মাঠের রাজনীতিতে এগুলো অত্যন্ত কার্যকর।
বস্তিবাসীদের কাছে তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় পরিচয় রাজনীতিকের পাশাপাশি পারিবারিক ও আবেগী— ‘ম্যাডাম খালেদা জিয়ার ছেলে।’ এই আবেগ, দীর্ঘদিনের অবহেলা আর ‘ক্ষমতাবান একজন মানুষ’ পাশে দাঁড়ানোর আশা— এই তিনের সমন্বয়েই ধানের শীষের ঢেউ সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
অন্যদিকে, অভিজাত ভোটারদের কাছে তারেক রহমানের আবেদন ভিন্ন। তাদের চোখে তিনি সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। ফলে এই আসনে তার প্রার্থী হওয়া মানেই ঢাকা-১৭-এর গুরুত্ব জাতীয় পর্যায়ে কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া। এই দ্বৈত ভোটব্যাংক— বস্তি ও অভিজাত একসঙ্গে টানতে পারাই তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি।

ঢাকা-১৭ আসনে গণসংযোগ করছেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আবদুস সালাম। ছবি: সারাবাংলা
বৈপরীত্যে ভরা ঢাকা-১৭ আসন
রাজধানীর গুলশান, বনানী, নিকেতন, মহাখালী, বারিধারা ও শাহজাদপুরের পাশাপাশি ঢাকা সেনানিবাসের মাটিকাটা, মানিকদি ও নামাপাড়ার একাংশ নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনটি বৈপরীত্যে ভরা একটি জনপদ। নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার রয়েছেন ৯১ হাজার ১৭৫ জন, আর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ভোটার সংখ্যা ৬০ হাজার ৮২৫ জন। এ ছাড়া, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভোটার ৩৯ হাজার ৫৬২ জন, ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৯ হাজার ৩২ জন এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৪ হাজার ৪২৪ জন। এসব ভোটারের বড় একটি অংশই বস্তিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যা নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
মাঠের লড়াই: বিএনপির ‘ফুল-কোর্ট প্রেস’
এরই মধ্যেই তারেক রহমান মহাখালীর করাইল বস্তি এলাকা ও ভাষানটেক এলাকায় নিজেই জনসভায় অংশ নিয়েছেন। আপাতত সারা দেশে নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত থাকায় ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের হয়ে হাল ধরেছেন বিএনপির একঝাঁক কেন্দ্রীয় নেতা। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং ঢাকা-১৭ আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আব্দুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন দিনরাত এক করে ফেলছেন প্রচারে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক আবদুস সালাম মাঠের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঢাকা-১৭ এখন আর কোনো সাধারণ নির্বাচনি এলাকা নয়, এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রধান সিপাহশালারের এলাকা। আমরা যখন ভাষানটেক বা কড়াইলে যাচ্ছি, মানুষের চোখে-মুখে যে আকুতি দেখছি, তা কেবল ভোটের নয়, তা হলো তাদের প্রিয় নেতাকে কাছে পাওয়ার। ইনশাআল্লাহ, ধানের শীষ এখানে বিজয়ের নতুন রেকর্ড গড়বে।’
একই সুরে কথা বললেন ঢাকা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন। তিনি মাঠের চিত্র তুলে ধরে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমি নিজে প্রতিটি ওয়ার্ডে যাচ্ছি। সাধারণ রিকশাচালক থেকে শুরু করে গুলশানের করপোরেট ব্যক্তি, সবাই মনে করছেন তারেক রহমান এই আসন থেকে নির্বাচিত হওয়া মানে ঢাকা-১৭ এর উন্নয়ন। কড়াইল বস্তির মা-বোনেরা তাকে ‘ম্যাডামের ছেলে’ হিসেবেই শুধু নয়, বরং আগামীর রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বরণ করে নিয়েছে।”

ঢাকা-১৭ আসনে গণসংযোগ করছেন ঢাকা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন। ছবি: সারাবাংলা
বস্তি বনাম অভিজাত— ভোটারদের দ্বৈত মনস্তত্ত্ব
এই আসনের ৩ লাখ ২৫ হাজার ভোটারের বড় অংশই বস্তিবাসী। তাদের কাছে তারেক রহমান মানেই ‘বড় নেতা’, যিনি তাদের জীবনের রূপান্তর ঘটাতে পারেন। ২৩ জানুয়ারি ভাষানটেকের জনসভায় তারেক রহমান যেভাবে রিকশাচালক ও গার্মেন্টস কর্মীদের মঞ্চে ডেকে নিলেন, তা বস্তিবাসীর মনে গভীর রেখাপাত করেছে।
অন্যদিকে, গুলশান-বনানীর অভিজাত ভোটাররা দেখছেন ‘ফিউচার পিএম’ ফ্যাক্টর। তাদের মতে, তারেক রহমান নির্বাচিত হওয়া মানে এই এলাকার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মান উন্নত হওয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকের চোখে
একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, তারেক রহমানের প্রার্থিতা এই আসনের ডাইনামিক্স বদলে দিয়েছে। তারেক এখানে ‘সুপার হেভিওয়েট’ প্রার্থী হওয়ায় জামায়াতের জন্য নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ধানের শীষের ঢেউ কি পালটে দেবে সমীকরণ?
তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি এবং ভাষানটেকে বস্তিবাসীদের জন্য ফ্ল্যাট তৈরির প্রতিশ্রুতি এলাকাটিতে ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে কাজ করছে। তাই ঢাকা-১৭-এর নির্বাচন এখন আর শুধু স্থানীয় লড়াই নয়; এটি জাতীয় রাজনীতির একটি থার্মোমিটার। তবে সব ছাপিয়ে ঢাকা-১৭ এখন তারেক রহমানের রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ সাজাচ্ছে বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা। শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের ঢেউ কি সব বাধা ধুয়ে-মুছে নিয়ে যাবে? উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের লড়াই পর্যন্ত।