চট্টগ্রাম ব্যুরো: ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’র সমঝোতা অনুযায়ী চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও নগরীর একাংশ) আসনটি পেয়েছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। চট্টগ্রামে এই একটিমাত্র আসনে ‘জুলাই আন্দোলনকারী’ তরুণদের দল এনসিপির প্রার্থী আছে। কিন্তু ওই আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. আবু নাছের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। কিন্তু প্রত্যাহারের শেষদিনে চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতে ইসলামী সংবাদ সম্মেলন করে তাদের প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বলে ঘোষণা দেয়।
এর পর গত ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে নির্বাচনি জনসভায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফের হাতে শাপলাকলি প্রতীক তুলে দিয়ে তাকে ১১ দলের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করে দেন। কিন্তু ভোটের আগমুহূর্তে হঠাৎ করেই জামায়াত নেতা আবু নাছের গত তিনদিন ধরে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে গেছেন। নির্বাচনি কার্যালয় উদ্বোধন, গণসংযোগ, পথসভা, কবর জিয়ারতসহ আরও নানাভাবে শুরু করেছেন প্রচার।
এতে নতুন দল এনসিপির প্রার্থী জোবাইরুল হাসান আরিফ কার্যত নির্বাচনের মাঠে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় দলটির হতাশ ও ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামায়াতের প্রার্থীর সমালোচনায় সরব হয়েছেন। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি প্রার্থীর এই ‘রশি টানাটানিতে’ বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। স্থানীয় ভোটারদের মতে, শুরুতে প্রচারের মধ্য দিয়ে জোরালো অবস্থান তৈরি হলেও মাঝপথে এসে প্রার্থী হওয়া নিয়ে দোলাচলে পিছিয়ে গেছেন আবু নাছের। এতে এরশাদ উল্লাহ অনেকটা খালি মাঠে গোল দেবেন বলে ধারণা ভোটারদের।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর ভোটের মাঠে ফেরা নিয়ে জানতে চাইলে দলটির বোয়ালখালী উপজেলার আমির মোরশেদুল আলম সারাবাংলাকে বলেন, ‘এনসিপির জোবাইরুল আমাদের ১১ দলের প্রার্থী। আমরা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সাংগঠনিকভাবে অবশ্যই তার পাশে আছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জোবাইরুলকে এলাকায় কেউ চেনে না। তার সঙ্গে ১০০-২০০ লোক থাকলেও হতো। কিন্তু নাছেরের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেশি। তার ব্যক্তিগত ভিত্তি জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তির চেয়েও বেশি। দলমত, ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে এলাকার মানুষ তাকে ভালোবাসে।’
‘আমরা তাকে নির্বাচনের মাঠে আসতে নিষেধ করেছিলাম। এজন্য উনি আটদিন বাসা থেকে বের হননি। আমিরে জামায়াতের জনসভায়ও যাননি। তখন এলাকার লোকজন গিয়ে তাকে বাসা থেকে বের করে আনে। এই লোকগুলো জামায়াত করে না, তাদের আমরা নিয়ন্ত্রণ করব কীভাবে! সাধারণ লোকজন নাছেরকে আবার নির্বাচনের মাঠে টেনে এনেছে।’
আর জোবাইরুল হাসান আরিফের আশা, জামায়াতে ইসলামীসহ শরিক দলগুলো যদি শক্তভাবে এনসিপির পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন।
মহানগরীর উপকণ্ঠে বোয়ালখালী উপজেলা এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাঁচটি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-৮ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৯ জন। বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপি ছাড়াও এখানে তিনজন প্রার্থী আছেন। এরা হলেন- ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ এমদাদুল হক (আপেল), ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ নুরুল আলম (হাতপাখা) ও ইসলামী ফ্রন্টের সৈয়দ মুহাম্মদ হাসান (মোমবাতি)।
ভোটারদের মতে, যথারীতি বিএনপির ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। তবে ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতিও চমক দেখাতে পারে।
চট্টগ্রাম-৮ আসন বরাবরই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খান এ আসন থেকেই নির্বাচিত ছিলেন। ২০০৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবশ্য এরশাদ উল্লাহকে এ আসনে বিএনপি মনোনয়ন দিয়েছিল। কিন্তু সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নৌকার জোয়ারে তিনি টিকতে পারেননি। সেখানে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তির ধারে-কাছেও এতদিন জামায়াতে ইসলামী দৃশ্যমান ছিল না। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ আগেভাগেই মাঠে নেমে যান ডা. আবু নাছের। গত দেড় বছর ধরে ধারাবাহিক সাংগঠনিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি মোটামুটি জামায়াতকে আলোচনায় আনতে সক্ষম হন।
স্থানীয় ভোটারদের মতে, প্রার্থীদের মধ্যে এরশাদ উল্লাহ, আবু নাছের ও সৈয়দ মুহাম্মদ হাসান পরিচিত মুখ। চিকিৎসক হিসেবে আবু নাছেরের আলাদা পরিচিতি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আছে। পক্ষান্তরে এনসিপির জোবাইরুল হাসান আরিফ ভোটের মাঠে নতুন, ভোটারদের কাছে তেমন পরিচিত নন। সৈয়দ মুহাম্মদ হাসানের রাজনৈতিক দল ইসলামী ফ্রন্টের এ আসনে সাংগঠনিক ভিত্তি আছে।
এরশাদ উল্লাহ চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও বনেদি পরিবারের সন্তান। নির্বাচনি প্রচার কার্যক্রমের শুরুতে গতবছরের গত ৩ নভেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার চালিতাতলী এলাকায় এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনি প্রচারে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলা। এ ঘটনায় ভোটারদের মধ্যে এরশাদ উল্লাহর প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিমত।
তবে এরশাদ উল্লাহ নির্বাচনের মাঠ একেবারে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন দেখছেন না। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি কাউকে দুর্বল প্রার্থী হিসেবে দেখছি না। ভোট করতে যখন নেমেছি, সব প্রার্থীই আমার কাছে সমান। আর ভোট মানেই চ্যালেঞ্জ। ভোটাররাও এখন অনেক সচেতন। আমি আমার বক্তব্য তুলে ধরছি। অন্য প্রার্থীরা উনাদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। ভোটাররা সবকিছু নির্ধারণ করবেন।’
নির্বাচনি প্রচারে এরশাদ উল্লাহকে মূলত ‘বোয়ালখালীর দুঃখ’ হিসেবে খ্যাত কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন, বোয়ালখালীকে একটি উপশহর হিসেবে গড়ে তোলা, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, বায়েজিদ বোস্তামি এলাকা থেকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, মাদক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে ডা. আবু নাছের সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি নির্মূল, কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন, নদীভাঙন রোধসহ আরও নানা প্রতিশ্রুতি এতদিন যা দিয়ে এসেছিলেন, সেগুলো অব্যাহত রেখেছেন। এনসিপির জোবাইরুল তার মূল প্রতিশ্রুতি হিসেবে তুলে ধরছেন কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়নকে।
বোয়ালখালী উপজেলার দক্ষিণ সারোয়াতলী গ্রামের বাসিন্দা ব্যাংকার ইসমাইল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এখানে বিএনপির সাপোর্টার বেশি। তবে নাছেরও একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো প্রার্থী নন। আওয়ামী লীগ যেহেতু নির্বাচন করতে পারছে না, তাদের সমর্থকরা যদি ভোটকেন্দ্রে যান, তাহলে ভোট ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে ভাগ হবে। কিছু ভোট মোমবাতির দিকেও যেতে পারে।’