Friday 06 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

নির্বাচনি ইশতেহার
‘নতুন ভিশন’ নিয়ে আসছেন তারেক রহমান

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৭

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ফাইল ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, মামলা-হামলা আর নির্বাসনের মেঘ কাটিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাঠে নেমেছে বিএনপি। এবার সেই নির্বাচন উপলক্ষ্যে ইশতেহার ঘোষণার পালা। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেল সাড়ে ৩টায় হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে ঘোষিত হতে যাচ্ছে বিএনপির সেই কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনি ইশতেহার।

বিএনপি বলছে, এই ইশতেহার কেবল একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘ব্লু-প্রিন্ট’। দলের সাবেক চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করবেন দলটির বর্তমান কাণ্ডারি তারেক রহমান।

বিজ্ঞাপন

ভিশন যখন ‘পাবলিক এমপাওয়ারমেন্ট’

প্রকৃতপক্ষে বিএনপি নির্বাচনে আসছে অনেকদিন পর। দশম ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর এবারের নির্বাচন তাদের জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের চেয়েও বড় রাষ্ট্র সংস্কারের লড়াই। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী’র ভাষ্যমতে, তারেক রহমান এবার এমন এক ইশতেহার ঘোষণা করবেন, যা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের একটি টেকসই রোডম্যাপ।

তারেক রহমানের অভিষেক: একটি ঐতিহাসিক বাঁক

পঞ্চম থেকে নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি ভোটেই বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে তিনি কারাবন্দি থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইশতেহার পাঠ করেছিলেন। তবে ২০২৬ সালের এই নির্বাচনে প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এবার তারেক রহমান নিজেই দলের প্রতিটি নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সেই হিসাবে এটি তার প্রথম নির্বাচনি ইশতেহার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইশতেহার ঘোষণার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান তার নেতৃত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবেন। তিনি শুধু দলের নেতা নন, বরং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার লক্ষ্য ও দর্শন কী- তারই একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চান জনগণকে।

ইশতেহারের মূল ভিত্তিতে যা থাকছে

বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমীনের কথা থেকে স্পষ্ট যে, তাদের ইশতেহারের মূল ভিত্তি হচ্ছে ‘৩১ দফা’ এবং তারেক রহমানের ‘হি হ্যাজ এ প্ল্যান’ (He has a plan) দর্শন। বিএনপির এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি স্তম্ভ—

১. জনগণের ক্ষমতায়ন: রাষ্ট্রীয় মালিকানায় জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা।
২. সুরক্ষা ও নিরাপত্তা: প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধান।
৩. টেকসই উন্নয়ন: শুধু অবকাঠামো নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন যেখানে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান হবে।

এছাড়াও আটটি বিষয়ে তাদের প্রতিশ্রুতি পরিপক্ক। এর মধ্যে রয়েছে-

সামাজিক সুরক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’

বিএনপির পরিকল্পনার অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’। সরাসরি নারীর নামে ইস্যু করা এই কার্ডের মাধ্যমে মাসে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকার সাশ্রয়ী পণ্য সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। এটি একদিকে যেমন মুদ্রাস্ফীতির বাজারে পরিবারের ব্যয় কমাবে, অন্যদিকে এই সাশ্রয়কৃত অর্থ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে। যা নারীর আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তাকে টেকসই করবে।

উৎপাদনশীল খাত ও কৃষি এবং কর্মসংস্থানে ‘কৃষক কার্ড’

‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’-এই দর্শন থেকে ‘কৃষক কার্ড’ প্রবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বল্পমূল্যে কৃষি উপকরণ এবং সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করে কৃষিকে লাভজনক পেশায় রূপান্তরের লক্ষ্য এখানে স্পষ্ট। পাশাপাশি আইসিটি, ব্লু ইকোনমি এবং স্টার্টআপ খাতকে প্রাধান্য দিয়ে তরুণ প্রজন্মের জন্য আধুনিক কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখানো হয়েছে।

মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে স্বাস্থ্যসেবা

বিএনপি স্বাস্থ্যসেবাকে দোরগোড়ায় পৌঁছাতে এক লাখ দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কথা বলছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। এটি তৃণমূলের মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

মৌলিক অধিকার ‘শিক্ষা’য় গুরুত্ব

গতানুগতিক মুখস্থ বিদ্যার বদলে দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষা কেবল সনদ নয় বরং কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি হয়ে ওঠে।

পরিবেশ রক্ষায় খাল ও নদী খনন

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২৫ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খননের পরিকল্পনাটি যেমন পরিবেশবান্ধব, তেমনি কৃষির জন্য আশীর্বাদ।

ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় ইমাম ও পুরোহিতদের মাসিক সম্মানি

ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সবধর্মের পুরোহিত ও ইমামদের জন্য মাসিক সম্মানির প্রস্তাবটি সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি ইতিবাচক দিক।

ক্রীড়া শুধু শখ নয়, হবে পেশা

ক্রীড়াকে শুধু শখ নয়, পেশা হিসেবে গ্রহণযোগ্য করে গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। তাই স্কুল ও কলেজে পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর রূপরেখা

বিএনপি তাদের কর্মসংস্থান মডেলে তথ্যপ্রযুক্তিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে। বর্তমান বিশ্বে জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা, ই-কমার্স এবং গেমিং খাতকে তরুণদের প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নতুন উদ্যোক্তা বা স্টার্টআপ সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে তরুণদের কেবল ‘চাকরিপ্রার্থী’ নয়, বরং ‘চাকরিদাতা’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও, বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা বা ব্লু ইকোনমি এবং তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে (SME) অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এরসঙ্গে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প যুক্ত হলে গ্রাম ও শহরের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ‘ভিশন ২০২৬’

এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর ‘তরুণ ভোটার’। তারেক রহমান বারবার তার বক্তব্যে তরুণদের স্বনির্ভরতা ও স্বাধীনতার কথা বলেছেন। নির্বাচনি ইশতেহারে প্রযুক্তি-নির্ভর সমাজ গঠন এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যমুক্ত এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা থাকবে।

বিএনপির লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ভেঙে ভারসাম্য তৈরি করা হবে। দ্বিকক্ষ-বিশিষ্ট সংসদ এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্যের মতো সংস্কার প্রস্তাবগুলো এই ইশতেহারের বড় চমক হতে পারে।

যেভাবে তৈরি হলো ইশতেহার

বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, এবারের ইশতেহার কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে তৈরি করা হয়নি। বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল সারাবাংলাকে জানান, ইশতেহারটি তৈরির আগে বিভাগ, জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে।

তৃণমূলের এই জনসম্পৃক্ততাই বিএনপির ইশতেহারকে জনবান্ধব করে তুলবে বলে তাদের বিশ্বাস। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলার মতো বিষয়গুলোতে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ থাকবে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

প্রত্যাশা, বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ

আজকের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং পরিচালনা করবেন নজরুল ইসলাম খান। বিএনপির এই ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে রাজপথে এক নতুন স্পন্দন তৈরি হবে বলেই বিশ্লেষকদের ধারণা। তবে প্রশ্ন থাকছে বাস্তবায়ন হবে কীভাবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইশতেহার ঘোষণা একটি আনুষ্ঠানিকতা হলেও, বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় জনগণ এখন কেবল ‘সুন্দর কথা’ শুনতে চায় না। মানুষ চায় বাস্তবমুখী সমাধান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, বেকার সমস্যার সমাধান এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার— এই তিনটি জায়গায় ভোটাররা আপস করতে নারাজ।

তারেক রহমানের প্রথম ইশতেহার ঘোষণায় যখন তার পরিকল্পনার কথা বলবেন, তখন কেবল বিএনপি কর্মীরা নন, গোটা দেশ তাকিয়ে থাকবে সেই ‘ভিশনের’ দিকে। সাধারণ মানুষ কি তাদের সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবে? নতুন প্রজন্মের স্বপ্ন কি ঠাঁই পাবে এই ইশতেহারে? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বিএনপি চেয়ারম্যানের ঘোষণায়।

বিজ্ঞাপন

ভোটারদের দরজায় জামায়াত প্রার্থীরা
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৮

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর