ঢাকা: বাংলাদেশের গত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সর্বোচ্চ আসন পাওয়ার রেকর্ড ১৮টি। ৫ আগস্টের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে সেই জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় যেতে চায়। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে আগামী পাঁচ বছর তারা কী করবে এমন একটি পরিকল্পনাও তুলে ধরেছে গত ৪ ফেব্রুয়ারি। আর সেই পরিকল্পনার নাম নির্বাচনি ইশতেহার।
তাদের সেই ইশতেহার প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহলে বেশ আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে জামায়াতে ইসলামী যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা কি আদৌ বাস্তবায়ন করতে পারবে?
জামায়াতের ইশতেহারে রয়েছে রয়েছে নারীদের কর্মঘণ্টা কমানো এবং ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী ঘোষণা। অপরদিকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়। তাই প্রশ্ন এই ইশতেহার কি বাস্তবসম্মত রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা? নাকি নির্বাচনের আগে ভোটারদের মনোযোগ টানার রাজনৈতিক বয়ান। যা এদেশের মানুষ অতীতে বহুবার দেখেছে।
ইশতেহার ঘোষণার শুরুতে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দুর্নীতি, চাঁদাবাজমুক্ত একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তুলবেন। দলটির ভাষায় সততা, ঐক্য, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের ওপর দাঁড়ানো একটি মানবিক রাষ্ট্রই তাদের লক্ষ্য। ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় ২৬টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আলাদা করে ৪১ দফা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
দলটির দাবি, কয়েক লাখ মানুষের মতামত, বিশেষজ্ঞ টিম ও গবেষণার ভিত্তিতে তারা এই ইশতেহার তৈরি করেছে। ইশতেহারের সবচেয়ে বড় এবং আলোচিত অংশ অর্থনীতি। তারা ঘোষণা দিয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতি দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে নিয়ে যাবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশকে বিশ্বের বর্তমান ৩৫তম অর্থনীতি থেকে ২০তম অর্থনীতিতে উন্নীত করবে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং, আইসিটি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
বাস্তবতা হলো বর্তমানে দেশের জিডিপি সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। সেখান থেকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে প্রবৃদ্ধি, বিপুল বিনিয়োগ ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। ইশতেহারে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট টাইমলাইন বা ধাপে ধাপে রোডম্যাপ স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে স্বপ্নটি বড় হলেও বাস্তবায়নের পথ কতটা বাস্তব।
ড. সাব্বির আহমদের মতো বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবছর ৫০ লাখ কর্মসংস্থান এবং সাত শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান বৈশ্বিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় স্পষ্টতার অভাব রয়েছে।
জামায়াতের এই ইশতেহারে কর্মসংস্থানের বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা বলছে, দেশে প্রায় সাত কোটি কর্মক্ষম যুবশক্তির জন্য দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণ, আন্তঃসরকার চুক্তি, কম খরচে বিদেশযাত্রা এবং ঋণ সুবিধার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য ৫০ লাখ যুবকের বিদেশে কর্মস্থান। সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি বাতিল এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাখাতে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন, বাজেট বাড়িয়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করা এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নারীদের জন্য বিনাবেতনে স্নাতক পর্যন্ত পড়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে পাঁচ বছরের নিচে এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে নাগরিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা। স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ করা এবং ৬৪ জেলায় মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের ঘোষণা ইশতেহারে সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি। নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে জামায়াতে ইসলামীর এই ইশতেহার বড় স্বপ্ন, না বড় প্রতিশ্রুতি? এটা নিয়ে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র, দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, নারীবান্ধব কর্মনীতি- সবই শুনতে আকর্ষণীয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামী তাদের পুরোনো ভাবমূর্তি ভেঙে একটি আধুনিক ও মধ্যপন্থী ইসলামী ধারায় তুরষ্ক বা মালয়েশিয়ার আদলে আসার চেষ্টা করছে। এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দরকার শক্তিশালী প্রশাসন, দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং স্পষ্ট রোডম্যাপ। ইশতেহারে এই রোডম্যাপ কতটা পরিষ্কার সেটি এখন ভোটারদের বিচার করার বিষয়।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের রায়ই বলে দেবে এই ইশতেহার জনগণের আস্থা কতটা অর্জন করতে পেরেছে। আর যদি জনগণ তাদের পক্ষে রায় দেয় তাহলে কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে সেজন্য আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে।
সাংবাদিক মাহবুব কামাল একটি টেলিভিশন টকশোতে অংশ নিয়ে জামায়াতের ইশতেহার নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘সব নির্বাচনে আমরা দেখি, ইশতেহারে নানা রকম প্রতিশ্রুতি। বাস্তবতা বলে না, এগুলো বাস্তবায়নযোগ্য। তারপরও আমরা একটা সুইট ড্রিম দেখাই। আমার ব্যক্তিগত অভিমত। বড় বড় প্রমিজ দেখানোর দরকার নেই। ছোট ছোট প্রমিজ যেগুলোর বাটারফ্লাই ইফেক্ট আছে। যেটা বাস্তবায়িত হবে, সেটা করা উচিত। আমরা এত বড় ইশতেহার দিই, যেটা আসলে শেষ পর্যন্ত হতাশা তৈরি করে।’
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-প্রচার সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার সুমন সারাবাংলাকে বলেন, ‘জামায়াত দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বিদেশে টাকা পাচার রোধ করতে পারলে নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন কঠিন হবে না। জামায়াত নির্বাচনি ইশতেহারে যেসব বিষয় ঘোষণা দিয়েছে তা বাস্তবায়ন করবে ইনশাল্লাহ।’