Monday 09 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সিলেট-১ আসন
বিএনপির দুর্গে জামায়াতের চ্যালেঞ্জ

জুলফিকার তাজুল, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০১

সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমান। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

সিলেট: বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে এমন কিছু আসন আছে, যেগুলোর ফলাফল শুধু একটি এলাকার নয়, পুরো দেশের রাজনীতির দিকনির্দেশনা দেয়। সিলেট-১ তেমনই একটি আসন। সিটি করপোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি এখন ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেই মাঠে, তবুও যেন উত্তাপ কমেনি একটুও।

বিএনপির ক্লিন ইমেজ প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, নাকি জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমান— মর্যাদার এই আসনে কার গলায় উঠবে বিজয়ের মালা? এ নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র কৌতুহল। সেইসঙ্গে মাঠে আছেন গণ-অধিকার পরিষদ, ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ, বাসদ ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী। সবমিলিয়ে সমীকরণটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

সিলেট বিভাগের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও আলোচিত আসন সিলেট-১। কারণ, যে দল এখান থেকে বিজয় লাভ করে, তারা শুধু সিলেট নয়, প্রায় সময় সরকার গঠনের দিকেও প্রভাব রাখে। ফলে জাতীয় পর্যায়েও এই আসনের ফলাফলের প্রতিধ্বনি পড়ে। পুরো দেশের রাজনীতিবিদরাও কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে থাকেন এই আসনের দিকে।

একসময় এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই ছিল সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বনাম সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। দুই কিংবদন্তি রাজনীতিকের তুমুল লড়াই শুধু সিলেট নয়, দেশের মানুষকেও টানতো। উন্নয়ন, সুশাসন, অর্থনীতি— সবকিছুই এই আসনের নির্বাচনে প্রতিফলিত হতো।

২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী এম সাইফুর রহমানকে হারিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল মাল আবদুল মুহিত জয় পান এ আসনে। এর পর ২০১৮ সালে জয় পান তার ছোট ভাই ড. এ কে আব্দুল মোমেন, যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আসনটি ছিল আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। ৫ আগস্ট পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। ফলে পুরো খেলাই এখন এক নতুন ভারসাম্যে দাঁড়িয়ে গেছে।

ভোটারদের মন জয়ে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ

বিএনপি মাঠে-ময়দানে ভোটের জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সিলেটে এখন প্রধান আলোচনার বিষয়— কে পড়ছেন বিজয়ের মুকুট? বিএনপি, নাকি জামায়াতের প্রার্থী। না অন্য কোনো দলের প্রার্থী।

এই আসনে মূলত বিএনপি জামায়াতের দুই হেভিওয়েট প্রার্থী আছেন। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী মুখ খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং জামায়াতে ইসলামীর সুরা সদস্য ও জেলা আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান। দু’জনই সিলেটের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত ও জনসম্পৃক্ত নাম। তবে কে হচ্ছেন এই আসনের এমপি— এটাই এখন সিলেটের গলি থেকে রাজধানী পর্যন্ত আলোচনার মূল বিষয়।

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটের রাজনীতিতে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা। রাজনীতি, শিক্ষা, প্রশাসন— সবখানেই তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সিলেট-১ আসন পুনরুদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে মাওলানা হাবিবুর রহমান শহর ও সদর উপজেলার তৃণমূল ভোটারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাই দীর্ঘদিন থেকে স্বাস্থ্য-সেবায় দারিদ্র্য মানুষের পাশে দাঁড়িছেন। সমাজসেবা ও জনসম্পৃক্ততার জন্য তার জনপ্রিয়তা এখনো অটুট।

যা বলছেন ভোটাররা

মেজরটিলা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ওলিউর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘১৭ বছর উন্নয়ন বঞ্চিত সিলেটের মানুষ। বন্যা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রেল যোগাযোগ, পর্যটন শিল্প-চা শিল্প প্রবাসীদের নানা সংকট, সব মিলিয়ে বিগত বছরগুলোতে উন্নয়নের ছিটাফোঁটা লাগেনি এ অঞ্চলে। তাই এবার আমরা দল নয়, প্রার্থী দেখে ভোট দেব।’

আহনাফ মাহবুব নামে কলেজ পড়ুয়া তরুণ ভোটার সারাবাংলাকে বলেন, ‘এবারের সিংহভাগ ভোটার তরুণ। তাই, তরুণদের কাছে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। যারা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে, তার ওপর আমাদের আস্তা তৈরি হবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা আরও বলছেন, বিএনপি ও জামায়াতের দু’জনই যোগ্য প্রার্থী। তবে এবারের ভোটারের সিংহভাগ তরুণ। অনেকেই বলছেন, সিলেটের উন্নয়নে ও দুর্নীতিমুক্ত থেকে যিনি বেশি গ্রহণযোগ্য, তাকেই সাধারণ জনগণ বেছে নেবে। সিলেট শহর ও সদর উপজেলার ভোটারদের একটি বড় অংশ শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। তারা দলীয় আনুগত্যের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, সততা ও স্থানীয় ইস্যুকে গুরুত্ব দেন।

অনেক তরুণই বলছেন, আমরা চাই এমন একজন এমপি, যিনি শুধু দল নয়, শহরের জন্য কাজ করবেন। তারা বলছেন, আগের মতো আবেগনির্ভর ভোট আর হবে না। এবার প্রার্থীদের মাঠে উপস্থিতি, বাস্তব পরিকল্পনা ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিই হবে প্রভাবক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যা বলেন

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আসনের ভোটাররা এখন দল নয়, প্রার্থী নির্ভর ভোট দেন। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা এখানে অনেক বেড়েছে। নতুন প্রজন্ম চায় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতি। তাদের মতে, সিলেট-১ আসন শুধু একটি সংসদীয় এলাকা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবেগের প্রতীক। এখানকার ভোটের ফলাফল প্রায়ই দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত দেয়। তারা বলছে, সিলেট হচ্ছে প্রবাসী অধ্যুষিত, শিক্ষিত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে সচেতন একটি অঞ্চল। ফলে এখানকার ভোটে আবেগের পাশাপাশি যুক্তিও বড় ভূমিকা রাখে।

এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুল হাসান, গণ-অধিকার পরিষদের মনোনীত প্রার্থী আকমল হোসেন ভোটারের দুয়ারে দুয়ারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে, এবারের জটিল সমীকরণে নতুন উপাদান যোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান। তিনি শুরু থেকেই একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমে সক্রিয় প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। ধর্মভিত্তিক ভোট ব্যাংক ও স্থানীয় নেটওয়ার্কের ওপর ভর করে তার প্রচার বাড়ছে, যা বিএনপির ভোট হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে সিলেট-১ আসন হয়ে উঠেছে এক চতুর্মুখী রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু— যেখানে রয়েছে বিএনপির মুক্তাদির, জামায়াতের মাওলানা হাবিব, গণ-অধিকার পরিষদের আকমল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান। বিশ্লেষকদের ধারণা, সিলেটের এই আসন যে দলের দখলে যাবে, সেই দলই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নেতৃত্বের বার্তা পাঠাবে।

সিলেট-১ মানে শুধু একটি সংসদীয় সিট নয়। এটি সিলেটবাসীর আত্মমর্যাদার প্রতীক। এখানকার মানুষ রাজনীতিকে দেখেন অনুভূতি, মর্যাদা ও দায়িত্বের জায়গা থেকে। তাই এবারের নির্বাচনে সিলেট-১ আসন আবারও হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক তাপমাত্রা মাপার কেন্দ্রবিন্দু। বিএনপির প্রার্থী যেই হন না কেন, তাকে শুধু দল নয়, সিলেটের মানুষেরও প্রতিনিধি হতে হবে। কারণ, সিলেট-১ জয় মানে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অধ্যায় লেখা।

ভোটার সংখ্যা

সিলেট-১ আসনের মোট ভোটার সংখ্যা ৬ লাখ ৮০ হাজার ৯৪৬ জন। যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৮৬ জন ও নারী ভোটার ৩ লাখ ২৭ হাজার ৭৪৭ জন। অর্থাৎ মোট ভোটের প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী। বিএনপি-জামায়াতের দুই শিবিরে নারী ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।

এ জন্য নারী ভোটারদের কাছে নিজেদের উন্নয়ন পরিকল্পনা, পরবর্তী কার্যক্রম ও প্রতিশ্রুতি পৌঁছে দেওয়াই দুই পক্ষের এখন মূল লক্ষ্য। নারী ভোটার টানতে জামায়াতের পক্ষ থেকে নারী নেত্রী কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রার্থীর কমিটমেন্ট ও পরিকল্পনা তুলে ধরছেন, যাতে ভোটাররা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়ন করতে পারে।

উল্লেখ্য, এই আসনে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ পাঁচ বার, বিএনপি তিন বার, একবার জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র থেকে একবার জয়লাভ করে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর