Wednesday 11 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কুমিল্লার ১১টি আসনে টানটান উত্তেজনা, শেষ সময়ে জটিল সমীকরণ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫৬ | আপডেট: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৫৭

কুমিল্লার ১১ টি আসনের মনোনীত প্রার্থীরা।

কুমিল্লা: ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে কুমিল্লার বিভিন্ন আসনে হেরফের হচ্ছে ভোটের সমীকরণ। কোথাও দলীয় কোন্দল, কোথাও জোটভিত্তিক লড়াই আবার কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি-সব মিলিয়ে শেষ মুহূর্তে বেশ জমে উঠেছে নির্বাচনি মাঠ।

কুমিল্লার ১১টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ৪৯ লাখ ১০ হাজার ৬১১ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ১ হাজার ৪শত ৯১ টি ও ভোট কক্ষের সংখ্যা ৯ হাজার ৪ শত ৬ টি।

সব মিলিয়ে নির্বাচনি উত্তেজনায় টগবগ করছে পুরো জেলা। এখন প্রার্থীরা বসে বসে কষছেন ভোটের অঙ্ক, আর ভোটাররা ভাবছেন-কোথায় কেমন পালটে যেতে পারে সমীকরণ।

কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি–মেঘনা)

বিজ্ঞাপন

৪ লাখ ৩৩ হাজার ৪০৪ ভোটারের এ আসনে মূল লড়াই বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন ধানের শীষ এবং ১১ দলীয় প্রার্থী মো. মনিরুজ্জামান দাঁড়িপাল্লা-এর মধ্যে।

মনিরুজ্জামান শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, তার ভোটারদের পথে বাধা দেওয়া হতে পারে। তবে ড. মোশারফ বিশ্বাস আরও বলেন, ‘প্রশাসন সুষ্ঠু, সুন্দর ও স্বাভাবিক নির্বাচন উপহার দেবে।’

ভোটাররা দুই ভাগে বিভক্ত হলেও মাঠ পর্যায়ে বিএনপির প্রার্থীর অবস্থান কিছুটা এগিয়ে আছে বলে মনে করছেন অনেকে। তবে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীও হাল ছাড়তে নারাজ।

কুমিল্লা-২ (হোমনা–তিতাস)

ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশগ্রহণ করবে ৩ লাখ ৭০ হাজার ৪৮০ ভোটার। এ আসনে ৬ জন প্রার্থী থাকলেও ত্রিমুখী লড়াই হবে। এখানে ধানের শীষের প্রার্থী মো. সেলিম ভূইয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী, প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার এপিএস-২ মো. আব্দুল মতিন তালা প্রতীক নিয়ে। লড়াইয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন ১১ দলীয় প্রার্থী মো. নাজিম উদ্দিন দাঁড়িপাল্লা।

বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে এখানে বিএনপি ভোট ছত্রভঙ্গ হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। অনেক ভোটারই মনে করছেন এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দাঁড়িপাল্লা ও তালা প্রতীকের মধ্যে।

কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর) নবীনে প্রবীণে হাড্ডাহাড্ডি, জমজমাট প্রতিযোগিতা হবে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৩ ভোটারের মুরাদনগর আসনে। ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও আলোচনায় আছেন দুইজন প্রার্থী। কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ ধানের শীষ ও মো. ইউছুফ সোহেল দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে।

৫ বারের এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী কায়কোবাদ অভিযোগ করেন-প্রশাসন তাকে সহযোগিতা করছে না, বরং বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি তরুণ ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন-‘তোমরা তোমাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে জেনে নাও, মুরাদনগরের জন্য আমি কী করেছি।’

১১ দলীয় প্রার্থী ইউছুফ সোহেলও একই ধরনের শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। যদিও এ আসন ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, তবুও এবার পরিবর্তনের ভাবনা অনেক ভোটারের মনেই কাজ করছে। তাই এই আসনে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি, এমন মত স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ও ভোটারদের।

কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার)

৪ লাখ ৬ হাজার ১২৩ ভোটারের এ আসনটি শুরু থেকেই ছিল আলোচনায়। বিএনপি মনোনীত মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়ন উচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ার পর অনেকে মনে করেছিলেন, ১১ দলীয় শাপলা কলির প্রার্থী আবুল হাসনাত প্রায় নিশ্চিত বিজয়ের পথে। কিন্তু শেষ সময়ে মুঞ্জুরুল আহসান মুন্সী গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জসিম উদ্দিনকে সমর্থন করায় ভোটের হিসাব কিছুটা পালটে যায়। যদিও পরবর্তীতে ‘বেফাঁস’ মন্তব্যের জেরে তিনি নির্বাচন ও দল-দুটো থেকেই বাদ পড়েন। ফলে, এ আসনে আবুল হাসনাত এগিয়ে থাকলেও, শেষ মুহূর্তে ভোটের সমীকরণ বেশ জটিল আকার ধারণ করবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।

কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া)

৪ লাখ ৭১ হাজার ২৫১ ভোটারের এ আসনে ১০ প্রার্থী থাকলেও, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির জসিম উদ্দিন ও বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সমর্থিত ১১ দলীয় দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মোবারক হোসাইনের মধ্যে। শুরুতে বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় দাঁড়িপাল্লার পক্ষে জনসমর্থন বাড়তে দেখা গেছে। ভোটারদের ধারণা, এখানে হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এ আসনে যে প্রার্থীই বিজয়ী হন ভোটের পার্থক্য খুব বেশি হবেনা।

কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর, সেনানিবাস, মহানগর–সদর দক্ষিণ)

জেলায় সর্ববৃহৎ ৬ লাখ ৩১ হাজার ৬৭৫ ভোটারের এই আসনে লড়াই হচ্ছে, বিএনপি মনোনীত মো. মনিরুল হক চৌধুরী ও বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতিককের প্রার্থী কাজী দ্বীন মোহাম্মদের মধ্যে। শুরুতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। ফলে ধানের শীষ ভালো অবস্থানে থাকলেও দাঁড়িপাল্লাও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলবে। এ আসনে সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, এবার অনেক ভোটারই চুপ হয়ে আছে। চুপ থাকা ভোটারদের সমর্থন যে পাবে সেই এ আসনে এমপি হিসেবে জয়ী হবেন।

কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা)

৩ লাখ ২৪ হাজার ৭৮১ ভোটারের এ আসনে মূল লড়াই বিএনপি বনাম বিএনপি। বিএনপির দলীয় ধানের শীষের প্রার্থী রেদোয়ান আহমেদের মুখোমুখি হয়েছেন স্বতন্ত্র কলস প্রতীক আতিকুল আলম। স্থানীয়দের মতে, বিদ্রোহী প্রার্থী আতিকুল আলম রেদোয়ান আহমেদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারেন। ভোটাররা মনে করেন, এ আসনে আতিকুল আলম বড় চমক দেখাতে পারেন। তবে ফলাফল যাই হোক লড়াই হবে মুখোমুখি।

কুমিল্লা-৮ (বরুড়া)

৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩২২ ভোটের এ আসনে বিএনপির জেলা সভাপতি জাকারিয়া তাহেরের সঙ্গে লড়ছেন বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামি সমর্থিত প্রার্থী মো. শফিকুল আলম হেলাল। শুরু থেকেই বিএনপি প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও দাঁড়িপাল্লাও মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে। সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকলেও। ভোটের নীরব বিপ্লব ঘটাতে পারে দাঁড়িপাল্লা।

কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ)

৪ লাখ ৫৭ হাজার ২৩৯ ভোটের এ আসনে প্রথম দিকে বিএনপির কোন্দল থাকলেও তা এখন অনেকটাই থেমেছে। লড়াই হবে বিএনপি প্রার্থী আবুল কালাম ও দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ছৈয়দ সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকীর মধ্যে। কোন্দল নিরসনের পর ধানের শীষ এখন তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে। তবে দাঁড়িপাল্লাও সহজে মাঠ ছাড়বেনা।

কুমিল্লা-১০ (লালমাই-নাঙ্গলকোট)

৫ লাখ ২৮ হাজার ৭২৭ ভোটারের এ আসনটি নিয়ে নাটকীয়তার শেষ নেই। প্রথমে বিএনপি গফুর ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দিলেও দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে তা বাতিল হয়ে যায়। পরে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বৈধতা পেয়ে ধানের শীষের প্রার্থী হন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত। বিএনপির স্থানীয় নেতা–কর্মীরা মনে করেন, গফুর ভূঁইয়ার সমর্থকরা একযোগে মাঠে নামলে মোবাশ্বের আলম এগিয়ে থাকবেন। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লার শিবির মনে করছে, বিএনপির অস্থিরতার সুযোগ কাজে লাগাতে তারা প্রস্তুত। তারা মনে করছেন, বিএনপির কোন্দল কাজে লাগিয়ে এ আসনে দাঁড়িপাল্লা বিজয়ী হবে।

কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম)

৪ লাখ ১৫ হাজার ৬১৬ ভোটারের এ আসনে জমজমাট লড়াই হচ্ছে, ধানের শীষের প্রার্থী কামরুল হুদা এবং দাঁড়িপাল্লার সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মধ্যে। সাধারণ ভোটাররা বলছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাড্ডাহাড্ডি হলেও সামান্য এগিয়ে আছে দাঁড়িপাল্লা। তবে তফসিলের পর থেকে এ আসনে হামলা পালটা হামলার ঘটনা ঘটলেও সাধারণ ভোটাররা মনে করেন, নির্বাচনের দিন প্রশাসনের নজর এ আসনে থাকবে। তারা নিরিবিলি ভাবে ভোট প্রয়োগ করতে পারবে।

সব মিলিয়ে কুমিল্লার ১১ টি আসনেই উত্তেজনা চরমে। কোথাও দলীয় কোন্দল, কোথাও জোটের শক্ত অবস্থান, কোথাও আবার প্রার্থী বাতিল–সব মিলিয়ে ভোটের দিন পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থাকছে সমানভাবে। তবে, দেশ স্বাধীনের পর থেকে এ জেলা বিএনপির ঘাঁটি হলেও এবার এখান থেকে একাধিক আসন পেতে পারেন বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর ১১ দলীয় জোট।

স্থানীয় শিক্ষক, সুশীল সমাজের নাগরিকরা মনে করেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এবার ভোটের বিপ্লব ঘটবে। এখন অপেক্ষা কেবল একদিন পরের সূর্যোদয়ের, যেদিন ব্যালটে নির্ধারিত হবে কুমিল্লার আগামী পাঁচ বছরের রাজনৈতিক ভাগ্যরেখা।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর