রংপুর: আসন্ন নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের ভোটারদের কাছে তিস্তা নদী এখন প্রধান ইস্যু। কৃষক, রিকশাচালক, দোকানি, দিনমজুর— সবার মুখে একই কথা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তিস্তাপাড়ে সুখ-শান্তি ফিরবে। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি ও আলোচনা সত্ত্বেও বাস্তবায়নের দৃশ্য না দেখে হতাশা বাড়ছে। সেই তিস্তা ইস্যু, তিস্তা তীরবর্তী মানুষের ভোটই নির্ধারণ করবে রাজনীতিবিদদের ভাগ্য।
উত্তরাঞ্চলের দুই কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনতে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিলেও হতাশা কাটছে না কোনোভাবেই।
নদী আন্দোলনের নেতারা বলছেন, তিস্তা নদীর অবিরাম ভাঙন উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবনে একটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার গজঘন্টা ইউনিয়নের মহিপুর গ্রামে সম্প্রতি ভাঙন শুরু হয়েছে, যা গ্রামবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মাসখানেক ধরে চর ভাঙছে। এতে ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। তিস্তা নদী গ্রামের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। গ্রামবাসীর আশঙ্কা, আর পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে ভাঙন গ্রামে পৌঁছে যাবে। নদীর পাশে দাঁড়ালেই বালুর চর ভেঙে পড়ার দৃশ্য চোখে পড়ে।
এদিকে সূর্যমুখী, শর্ষে, পেঁয়াজ, রসুন, আলু এবং তামাকের মতো ফসল চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করা কৃষকরা এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। তেমনই একজন কৃষক সিদ্দিকী মিয়া। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, তার তিন বিঘা জমির ফসল ভাঙনের কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই মুহূর্তেসরকারের হস্তক্ষেপ না হলে ক্ষতি অপূরণীয়। তার মতো অনেকেই জীবনে একাধিকবার বাড়ি হারিয়েছেন—ফিরোজা বেগমের ক্ষেত্রে তো ২৫ বার!
স্থানীয় বাসিন্দা মমিনুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আশপাশের ১০ গ্রামে পাকা বাড়ি দুর্লভ। কারণ, ভাঙনের ভয়ে মানুষ অস্থায়ী টিনের ঘরে বাস করে। স্থায়ী বাসস্থান গড়ে তোলা অসম্ভব, যা পরিবারের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন সারাবাংলাকে বলেন, ‘তিস্তার ভাঙন উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্য দূরীকরণের পথে প্রধান বাধা, এবং মহাপরিকল্পনা এই সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার।’
তিস্তা নদীর উৎস হিমালয়ের ৫ হাজার ৩৩০ মিটার উচ্চতায়, যা ভারতের সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে এর দৈর্ঘ্য ১১৫ কিলোমিটার, যা নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধার মধ্য দিয়ে বয়ে গিয়ে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে। ভারতে একাধিক বাঁধ নির্মাণের কারণে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ ৮০-৯০ শতাংশ কমে যায়, যা কৃষকদের সেচ খরচ ৩০০ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। বর্ষায় অতিরিক্ত পানিতে বন্যা সৃষ্টি হয়। এর আগে ২০২০ সালে ৯০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে ‘তিস্তা নদী: পরিবেশগত সংকট ও পুনরুদ্ধার’ গবেষণায় উল্লেখ আছে।
তিস্তা তীরের মানুষের আশা মহাপরিকল্পনায় নিহিত। মহিপুর বাজারের চায়ের দোকানি খাদেম মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটি বাস্তবায়িত হলে সমস্যার সমাধান হবে, যদিও অনেকে এর বিস্তারিত জানেন না।’ স্থানীয়রা নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, স্যাটেলাইট শহর এবং কলকারখানা গড়ে তোলার কথা শুনেছেন, যা জমি উদ্ধার এবং কৃষি বৃদ্ধি করবে। ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ নামক এই মহাপরিকল্পনায় নদী খনন, ভূমি উদ্ধার, বাঁধ মেরামত এবং সবুজ করিডর সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে, যার মোট ব্যয় ১২ হাজার কোটি টাকা।
এদিকে রাজনৈতিক দলগুলো এই ইস্যুকে নির্বাচনি প্রচারে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে বলেন, ক্ষমতায় এলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করবেন, এবং উত্তরাঞ্চলকে শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত করবেন। জামায়াতের শফিকুর রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, যেকোনো মূল্যে এটি বাস্তবায়ন করবেন, এবং চীনের সঙ্গে সহযোগিতা চাইবেন। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে তিস্তা এবং গঙ্গা পানি বণ্টনের কথা উল্লেখ আছে।
সূত্র জানায়, চীনের সহায়তায় প্রকল্পের অগ্রগতি চলছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে প্রযুক্তিগত আলোচনা হয়েছে, এবং উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান জানিয়েছেন, যাচাই শেষে কাজ শুরু হবে। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মাহামুদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় হতাশা রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রকল্পটি টেকসই করতে হবে। অন্যথায় এটি আরও সংকট সৃষ্টি করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিস্তার ভাঙনের কারণে উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্য দূর হচ্ছে না। মহাপরিকল্পনা জনপ্রিয় ইস্যু, কিন্তু এটি আন্তর্জাতিক বিষয়—বাংলাদেশ, চীন, ভারতসহ সব পক্ষের সম্মতি দরকার।’
পুরো উত্তরবঙ্গে তিস্তা এখন সবার ইস্যু। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও লালমনিরহাট-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় এলে পানির ন্যায্য হিস্যা ও দুই কোটি মানুষের দুঃখ দূর করবে।’ আর লালমনিরহাট-৩ আসনে জামায়াতের এমপি প্রার্থী আবু তাহের বলেন, ‘চীনের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত তার দল।’
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি প্রচারে তিস্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে তীরবর্তী মানুষের দাবি স্থায়ী সমাধান—ভাঙন রোধ, পানির ন্যায্য হিস্যা ও মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন। তাই এবারের নির্বাচনে তিস্তাপাড়ের মানুষের ভোটকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।