ঢাকা: প্রায় দুই দশকের রাজনৈতিক নির্বাসন ও দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট আজ এক আমূল পরিবর্তনের সাক্ষী হলো। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় উৎসবমুখর পরিবেশে শপথ নিলেন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার ৪৯ সদস্য।
একদিকে যখন নতুন মন্ত্রীদের বরণ করে নিতে উল্লাসে মাতোয়ারা দেশ, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। দলের একঝাঁক ‘হেভিওয়েট’ ও জ্যেষ্ঠ নেতা, যারা গত দুই দশকে বিএনপির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের কেন রাখা হলো না এই নতুন মন্ত্রিসভায়? এটি কি তারেক রহমানের ‘জেনারেশন নেক্সট’ গড়ার কোনো মাস্টারপ্ল্যান, নাকি অভিজ্ঞদের জন্য তোলা আছে অন্য কোনো বড় চমক?
অভিজ্ঞতার ওপর কি তারুণ্যের প্রাধান্য?
এবারের মন্ত্রিসভা গঠনের ধরনে একটি বিষয় পরিষ্কার, তারেক রহমান একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ ও ‘তারুণ্যনির্ভর’ কর্মক্ষম সরকার উপহার দিতে চেয়েছেন। তবে বর্ষীয়ানরা এই সংস্কারের বলি হলেন কি না, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। মাঠপর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী মনে করছেন, দলের এই দুর্দিনে যারা রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের মন্ত্রিসভার বাইরে রাখাটা এক ধরণের বিস্ময়। তবে এর পেছনে ‘এক ব্যক্তির এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নের জোরালো আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ড. আব্দুল মঈন খান
বিএনপির জ্যেষ্ঠ এই রাজনীতিককে নিয়ে আলোচনা ছিল বহুমুখী। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত মঈন খানের মন্ত্রিসভায় না থাকাটা সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। কেউ ভেবেছিলেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো দফতরের মন্ত্রী হবেন, আবার অনেকে ধারণা করেছিলেন তাকে জাতীয় সংসদের স্পিকারের আসনে দেখা যেতে পারে। সংসদীয় গণতন্ত্রে তার মতো একজন পণ্ডিত ও মার্জিত ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য, তাই তাকে হয়তো সংসদ পরিচালনার গুরুভার দেওয়া হতে পারে।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠতম সদস্য। সাধারণত এ ধরনের প্রবীণ এবং নীতি নির্ধারক নেতাদের মন্ত্রিসভায় না নেওয়ার পেছনে একটি বিশেষ সমীকরণ কাজ করে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, তাকে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করা হতে পারে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে একজন অভিজ্ঞ এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন, যা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়
বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিএনপির প্রবীণ ও প্রভাবশালী নেতা। তিনি ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং দলের অন্যতম শীর্ষ নীতিনির্ধারক। তিনি ঢাকা-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আজ শপথ নিয়েছেন, কিন্তু মন্ত্রিসভায় ডাক পাননি। ধারণা করা হচ্ছে, সরকারের চেয়ে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামে তার সক্রিয়তা বেশি প্রয়োজন মনে করছে হাইকমান্ড।
ড. রেজা কিবরিয়া
সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ্ এ এস এম কিবরিয়ার ছেলে এবং গণঅধিকার পরিষদের সাবেক নেতা রেজা কিবরিয়া এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকে লড়ে বিজয়ী হয়েছেন। বাবার মতো তিনিও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন- এমন গুঞ্জন ছিল তুঙ্গে। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানে তার ডাক না পড়ায় এটি পরিষ্কার যে, বিএনপির নীতিনির্ধারকরা আপাতত নিজ দলের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মুখগুলোর ওপরই বেশি আস্থা রাখছেন।
আন্দালিব রহমান পার্থ
ভোলা-১ আসন থেকে বিজেপি চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর বিজয় ছিল বেশ আলোচিত। ‘গরুর গাড়ি’ প্রতীক নিয়ে তিনি জামায়াতের প্রার্থীকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছেন। তার সোশ্যাল মিডিয়ায় আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে তরুণ প্রজন্মের ধারণা ছিল পার্থ মন্ত্রিসভায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাকে রাখা হয়নি। এটি কি কেবলই কৌশল, নাকি মিত্রদের জন্য তোলা আছে অন্য কোনো পুরস্কার, তা নিয়ে জল্পনা কাটছে না।
ফজলুর রহমান
কিশোরগঞ্জ-৪ আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়া মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে নিয়ে গুঞ্জন ছিল তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় পাবেন। নির্বাচনের বহু আগে থেকেই তিনি আলোচনায় ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার তালিকায় তার নাম না থাকাটা কিশোরগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে হতাশার সৃষ্টি করেছে।
আরও যারা নেই
এছাড়াও বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে বেগম সেলিমা রহমান, ওসমান ফারুক, আমানুল্লাহ আমান, শামসুজ্জামান দুদু ও লুৎফুজ্জামান বাবরও মন্ত্রিত্ব পাননি। এদের বাইরে সেলিম ভূঁইয়া, মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া, আজিজুল বারী হেলাল, হুম্মম কাদের চৌধুরী, আসাদুজ্জামান রিপন, নাজিমুদ্দিন আলম, রকিবুল ইসলাম বকুল প্রমুখও মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীদের তালিকায় নেই।
নতুন বার্তার খোঁজে বাংলাদেশ
স্থায়ী কমিটির একটি বড় অংশ মন্ত্রিসভার বাইরে থাকার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান সম্ভবত ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি বাস্তবায়নের স্পষ্ট বার্তা দিলেন। জ্যেষ্ঠ নেতাদের সরকার পরিচালনার সরাসরি চাপে না ফেলে দলকে সুসংগঠিত করার কাজে রাখা হতে পারে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর গঠিত এই নতুন সরকারে অভিজ্ঞদের অনুপস্থিতি কি শূন্যতা তৈরি করবে, নাকি নতুনদের উদ্যম দেশ পুনর্গঠনে গতি আনবে; সেটিই এখন দেখার বিষয়।