ঢাকা: রাজপথের ধুলোবালি আর টিয়ারগ্যাসের গন্ধ । ১৭ বছরের দীর্ঘ নির্বাসন, জেল-জুলুম আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে যে দলটি এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে, সেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি এখন ক্ষমতায়। প্রায় দেড় যুগের কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর, তার সুযোগ্য উত্তরসূরি তারেক রহমান এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে আসার পর দলটির সেই চিরাচরিত ‘রাজপথের স্পন্দন’ যেন আচমকা থেমে গেছে। নয়াপল্টনের স্লোগানমুখর বিকেল কিংবা গুলশানের রাজনৈতিক তৎপরতা- সবই এখন এক অদ্ভুত স্থবিরতার চাদরে ঢাকা। বিএনপির সাংগঠনিক প্রাণচাঞ্চল্য এখন প্রায় শূন্যের কোটায়।
নেতা-কর্মীশূন্য নয়াপল্টন
গত ১৭ বছরে বিএনপির রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল নয়াপল্টন। পুলিশি বেষ্টনী আর নেতা-কর্মীদের ভিড়ে মুখরিত সেই কার্যালয়টিই ছিল দলটির অস্তিত্বের প্রতীক। যদিও গত ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়াপল্টন বিএনপি অফিসে একটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। এবং সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে কার্যালয়ে গিয়ে অফিস করেছেন। তারপরও সেই পুরোনো কোলাহল আর প্রাণচাঞ্চল্য আর নেই। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন যেন নেতা-কর্মীশূন্য। অথচ এই কার্যালয়টি ঘিরেই বিএনপির কয়েক প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে। এখন সেখানে গেলে দেখা যায় খাঁ খাঁ শূন্যতা। আগে যেখানে প্রতিদিন কোনো না কোনো কর্মসূচি থাকতো, এখন সেখানে কেবল গুটিকয়েক অফিস স্টাফের আনাগোনা।
গুলশানে নেমেছে স্থবিরতা
গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়টি ছিল নীতি-নির্ধারণী আলোচনার প্রাণকেন্দ্র। এমনকি নির্বাচনকালীন বিএনপি নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের সংবাদ সম্মেলনগুলো গণমাধ্যমের জন্য ছিল তথ্যের প্রধান উৎস। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেখানে নীতিনির্ধারণী বড় কোনো সভা ছাড়া ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
ক্ষমতার ব্যস্ততা বনাম সাংগঠনিক স্থবিরতা
বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ এখন মন্ত্রিসভার সদস্য। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা এতটাই ব্যস্ত যে, দলের সাংগঠনিক কাজে সময় দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিংবা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে নিয়ে রাষ্ট্রপতি পদের আলোচনা চলছে। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এখন জাতীয় সংসদের স্পিকার। ফলে দলের স্থায়ী কমিটি ও নির্বাহী কমিটিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। দলের এই ‘হেভিওয়েট’ নেতাদের প্রশাসনিক ব্যস্ততা তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সব কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ
দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ে নতুন কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় সংগঠন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এই কমিটিগুলো নতুনভাবে গঠন করা প্রয়োজন। সূত্র জানায়, বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই অবস্থা এখন জরাজীর্ণ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও অনেক সংগঠন এক দশক পার করেছে একই নেতৃত্বে। মাঝে-মধ্যে পদ-পদবিতে দুয়েকটি পরিবর্তন ছাড়া সম্মেলনের কোনো তোড়জোড় লক্ষ্য করা যায় না।
বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালে। সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে ২০১৬ সাল থেকে আফরোজা আব্বাস ও সুলতানা আহমেদের নেতৃত্বে চলছে মহিলা দল। ইশতিয়াক আজিজ উলফাত ও সাদেক খানের নেতৃত্ব মুক্তিযোদ্ধা দল চলছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। আর ২০১৪ সালের পর শ্রমিক দলের কোনো কাউন্সিল দেখা যায়নি। তবে ২০২৪ সালে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়নি। আর ২০২৪ সালে কমিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর এখনো নতুন নেতৃত্ব পায়নি মৎস্যজীবী দল। সংগঠনটির সদস্য সচিব আব্দুর রহিমের মতো ত্যাগী নেতারা মনে করেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সম্মুখসারির এই সংগঠনটিকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
ছাত্রদল ও যুবদলে নীরবতা
বিএনপির প্রাণশক্তি বলা হয় ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলকে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এমনকি রাজীব আহসান সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পেয়েছেন। ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ গত ফেব্রুয়ারিতে শেষ হয়েছে, আর সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দলটির ভরাডুবি সংগঠনের ভেতরে অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
কথা হলো নয়াপল্টনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা যুবদলের এক কর্মীর সঙ্গে। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘এই কার্যালয় যেন আবার আগের মতো মুখরিত হয়। আমরা চাই কোলাহল মুখর সাংগঠনিক কার্যক্রম। কিন্তু শীর্ষ নেতাদের লবিং আর তদবিরের ভিড়ে আমাদের মতো সাধারণ কর্মীদের এই প্রত্যাশা যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে দৌড়ঝাঁপ
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে এখন দফতরে দফতরে পদপ্রত্যাশীদের ভিড়। দীর্ঘ ১৭ বছর যারা হামলা-মামলা খেয়েছেন, তারা এখন মূল্যায়নের আশায় কেন্দ্রীয় নেতাদের দরজায় কড়া নাড়ছেন। লবিং চলছে তুঙ্গে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন না করে কেবল লবিং দিয়ে কি একটি শক্তিশালী সরকার টেকানো সম্ভব?
বাড়ছে রাজনৈতিক শূন্যতার ঝুঁকি
সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, সংসদীয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হলে সাংগঠনিক বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, সরকার পরিচালনার মোহে যদি সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে তার মাশুল দিতে হবে ভবিষ্যতে। গুলশান কার্যালয়ে বসে নেতারা যেসব রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতেন, এখন সেখানে প্রশাসনিক ফাইলের স্তূপ। নয়াপল্টনের সেই কোলাহল এখন সচিবালয়ের করিডোরে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, জনবিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রথম ধাপ হলো সংগঠনকে অবহেলা করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি শক্তিশালী বিরোধীদল থেকে সরকারে রূপান্তরিত হওয়ার পর সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া মানে হলো আত্মঘাতী পথ বেছে নেওয়া। আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার মোহ খুব দ্রুত জনবিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। বিএনপি যদি মনে করে কেবল ক্ষমতায় থাকাই যথেষ্ট, তবে তারা বড় ভুল করছে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, কেবল গদিতে বসাই সার্থকতা নয়, বরং সাংগঠনিক কাঠামো সচল রেখে জনগণের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখাই হলো প্রকৃত রাজনীতি।
তারেক রহমানের নতুন চ্যালেঞ্জ
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হওয়া এবং এরপর নির্বাচনে জয় এনে দেওয়া, তারেক রহমানের জন্য এটি ছিল বিশাল সাফল্য। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের নিয়ে বসেছিলেন। সেখানে তিনি স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যেন ঈদুল ফিতরের পরেই অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো ঢেলে সাজানো হয়। তবে ৪ মার্চ দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দলের সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলকে শক্তিশালী করতে দ্রুততম সময়ে কাউন্সিল করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।’
আসছে কোরবানির ঈদের আগে দলের কাউন্সিল হবে কি না? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মহাসচিব বলেন, ‘ঈদের আগে সম্ভব নয়। কয়েক মাস সময় লেগে যাবে।’
বিএনপি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রাষ্ট্র গঠনের বিশাল কর্মযজ্ঞ, অন্যদিকে ধ্বংসপ্রায় সাংগঠনিক কাঠামো মেরামত। তৃণমূলের কর্মীরা চায় নয়াপল্টন আবার প্রাণ ফিরে পাক। তারা চায় তাদের প্রিয় নেতারা কেবল এসি রুমে বসে ফাইল সই না করে, মাঝে মাঝে নয়াপল্টনের ধুলোমাখা কার্যালয়ে এসে কর্মীদের পিঠ চাপড়ে দিক। কারণ, ১৭ বছরের লড়াইটা কোনো আমলার হাত ধরে নয়, বরং সাধারণ কর্মীদের রক্ত আর ঘামেই সফল হয়েছে। তারা অপেক্ষায় আছে, কত দ্রুত এই ‘সাংগঠনিক শূন্যতা’ কাটিয়ে সরব হবে বিএনপি।