ঢাকা: সংস্কার সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা ল্যাপস করে সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অপমান করছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ তুলে ধরেন দলটির নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এবং সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির।
এসময় সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কারের অংশ হিসেবে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে আমি গেস্ট হিসেবে অবদান রাখি। গত ১০ তারিখ সেগুলো পাসের বাধ্যবাধকতার সময় পার হয়ে যায়। ১১০ অধ্যাদেশ হুবহু কিংবা সংশোধিত আকারে পাস করা হয়েছে। ৭টি অধ্যাদেশকে রহিত করা হয়েছে। বাকী ১৬টি অধ্যাদেশকে ল্যাপস করা হয়েছে, অর্থাৎ এগুলো সংসদে উত্থাপিত হয়নি।
তিনি বলেন, দুর্ভাগ্য হলো গত ফ্যাসিবাদ সরকারের বিদায়ের পরে জনগণ আইনের শাসন ও সংস্কার নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে বিষয়গুলোতে জোর দিয়েছিল, যারা গত ১৬টি বছর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগের পৃৃথক সচিবালয় স্থাপনের যে বিষয় ছিল- এ সমস্ত বিষয়কে ল্যাপস করে দেওয়া হয়েছে, রহিত করে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা, সংস্কারের বিষয়গুলোকে অপমান করা হয়েছে। ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে।
নাজিবুর রহমান বলেন, আমরা সংসদে এ বিষয়গুলো নিয়ে ওয়াকআউট করেছি। তারা (সরকারি দল) বলেছে, বিশেষ কমিটিতে যেভাবে আলোচনা হয়েছে বিলগুলো সেভাবে উত্থাপিত হয়েছে, ল্যাপস হয়েছে কিংবা সংশোধিত আকারে উত্থাপিত হয়েছে। আমরা বিশেষ কমিটিতে যেভাবে আলোচনা করেছি, একমত হয়েছিলাম- যে বিষয়গুলোতে কোনো আপত্তি নেই সেগুলো কোনো আলোচনা ছাড়াই আমরা সমর্থন করব, বিলগুলো পাস হয়ে যাবে। যেসব বিষয়ে আপত্তি রয়েছে, নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিলাম- সেগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এই ওয়াদা ওরা(সরকারদলীয় এমপি) ভঙ্গ করেছেন।
মোমেন আরও বলেন, সংসদীয় বিশেষ কমিটির প্রকাশিত রিপোর্টে যে বিলগুলো রয়েছে তা সংসদে সেভাবে উত্থাপন করেননি। পুলিশ কমিশন যে অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে উত্থাপিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সেটি উত্থাপন করা হয়নি। নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও এক মাস পর সংসদ অধিবেশন আহ্বান করে সময় ক্ষেপণ করা হয়েছে। এতে ১৩৩টি বিল আইনে পরিণত করার জন্য সময় খুবই কম ছিল। এটি সরকারের ইচ্ছাকৃত সময় ক্ষেপণের কৌশল ছিল। যাতে করে এসব বিষয়ে শেষ দিকে এসে বেশি আলোচনা না হয়। কিছু কিছু বিলের ব্যাপারে সরকারি দল লুকোচুরি করেছে। বিল পাসের এক ঘণ্টা আগে, ১০ মিনিট আগে, ১৫ মিনিট আগে কাগজপত্র দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইন মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, গুম অধ্যাদেশে গুমের যে সংজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের যে সংজ্ঞা দুটি একই। এজন্য সরকার এটি বাদ করছেন- তাদের এই বক্তব্যটি মিথ্যা। এটি আইনগতভাবে কোনো সঠিক কথা নয়।
মানবাধিকার কমিশনের কমিশনারদের পদত্যাগের পর তাদের দেওয়া খোলা চিঠির উদ্ধৃতি দিয়ে শিশির মনির বলেন, খোলা চিঠিতে কমিশনাররা দেখিয়েছেন এক ধরনের অসত্য তথ্য উপস্থাপন করে আইনটিকে ল্যাপস করা হয়েছে। খোলা চিঠিতে বলা হয়েছে, গুম অধ্যাদেশের ২৮ ধারায় পদ্ধতিগত গুমের বিষয়টি বলা আছে।
গণভোটের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের বক্তব্য কোট করে শিশির মনির বলেন, তারা বলছেন এটা তো ফ্যাক্ট টার্ম ভ্যালিড, এটি ঘটনাক্রমে সিদ্ধ, আদেশ জারি হয়েছে, গণভোট হয়েছে সেটার বৈধতা আছে। এজন্য এখন আপনাদের দায়িত্ব হলো বাস্তবায়ন করা, বলেন শিশির মনির।
বিচারকদের স্বাধীনতার বিষয়ে শিশির মনির বলেন, বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা সব ন্যস্ত সুপ্রিম কোর্টের উপর। অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন শুধু সুপ্রিম কোর্ট। এজন্য আলাদা সচিবালয়। শুধু বিচারকার্যে স্বাধীনতা নয়, সকল ক্ষেত্রে স্বাধীনতা থাকতে হবে। যেখানে সরকারি দল বলছে শুধু বিচারকার্যে স্বাধীনতা।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ল্যাপস নিয়ে তিনি বলেন, আমরা মনে করি আইনগত যে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে সেগুলো সঠিক না হলে উপস্থাপন করা উচিত না।