ঢাকা: প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের ১১ তম গ্রেডে বেতন আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে শিক্ষকরা। দাবি আদায় না হওয়ায় আগামীকাল শনিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা।
তবে, শিক্ষকদের এই সমাবেশ ঠেকাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের একটি প্রজ্ঞাপনে শিক্ষকদের সমাবেশ থেকে বিরত রাখতে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেখানে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের শিক্ষকদের নিরুৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে, যে সকল শিক্ষক সমাবেশে অংশ নিতে পারেন, তাদের তালিকা তৈরি করে জরুরি ভিত্তিতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, শিক্ষক এবং সরকারের মধ্যেকার সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অপর দিকে, সারাদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষক মহাসমাবেশে অংশগ্রহণ করলে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
মহাসমাবেশ সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, আগামীকাল শনিবার (৩০ আগস্ট) সকাল ৯টায় ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে শিক্ষকদের এই মহাসমাবেশ শুরু হবে। প্রাথমিক শিক্ষকদের ছয়টি পৃথক সংগঠনের মোর্চা ‘সহকরী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ’ এই ব্যানারে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে দেশের ৬৪টি জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ঐক্য পরিষদের অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন জানান, শিক্ষকদের এই মহাসমাবেশে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণসংহতি আন্দোলন ও গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারকে একটি সময়সীমা দিয়েছিলাম, কিন্তু সেই সময়সীমা পার হয়ে গেলেও আমাদের দাবি পূরণে কোনো অগ্রগতি দেখছি না। আমাদের দাবি আদায়ের জন্য আমরা একটি সমাবেশের আয়োজন করছি। সমাবেশটি করার জন্য আমরা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছি। এতে সারা দেশ থেকে এক লাখেরও বেশি শিক্ষক অংশ নেবেন।’
তবে শিক্ষকদের এই মহাসমাবেশে অংশগ্রহণ ঠেকাতে গোয়েন্দা কার্যক্রম চলছে। গত বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের জারি করা একটি প্রজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, শিক্ষকরা যাতে ঢাকার মহাসমাবেশে অংশ নিতে না পারেন, সেজন্য জেলা শিক্ষা অফিসার এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের তাদের নিরুৎসাহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, যেসব শিক্ষক বিদ্যালয়ের পাঠদান বাদ দিয়ে সমাবেশে আসবেন, তাদের তালিকা, বিদ্যালয়ের নাম, কোন যানবাহনে আসবেন, সেই যানবাহনের নম্বর এবং শিক্ষকের সংখ্যা জরুরি ভিত্তিতে স্পেশাল ব্রাঞ্চের যেকোনো শাখায় জমা দিতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, সারাদেশ থেকে হাজার হাজার শিক্ষক মহাসমাবেশে অংশগ্রহণ করলে প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসবি’র গোয়েন্দা সূত্র থেকে জানা গেছে, এই মুহূর্তে দাবি আদায়ের চেয়ে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য। গোয়েন্দা তথ্যে আরও জানা গেছে যে, বিভিন্ন মহল থেকে সব রকম চেষ্টা চলছে এবং পতিত স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এমনও তথ্য রয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সব ধরনের আন্দোলনে ঢুকে একটি গণ্ডগোল পাকানোর চেষ্টা করতে পারেন।
যে তিন দাবিতে শিক্ষকদের মহাসমবেশ-
- প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের এন্ট্রি পদে ১১তম গ্রেডে বেতন-ভাতা দেওয়া।
- শতভাগ শিক্ষককে পদোন্নতি দেওয়া।
- ১০ ও ১৬ বছরপূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন করা।
দীর্ঘদিনের দাবি, নড়চড় নেই সরকারের
তিন দফা দাবি আদায়ে প্রাথমিকের শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। এই বছর, ৫ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত তারা সারা দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করেন। এরপর ১৭ মে থেকে কর্মবিরতির সময় বাড়িয়ে দুই ঘণ্টা করা হয় এবং ২১ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত শিক্ষকরা আধাবেলা কর্মবিরতি পালন করেন।
২৬ মে থেকে অনির্দিষ্টকালেরর কর্মবিরতি শুরু করেন তারা। টানা চারদিন কর্মবিরতির পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টার আশ্বাসে ১ জুন থেকে ক্লাসে ফিরে যান। আশ্বাসের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও দাবি পূরণ না হওয়ায় আবারও রাজপথে নামছেন প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকরা।
অন্যদিকে, বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, পদোন্নতিসহ চার দফা দাবিতে গত ১৮ জুলাই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সমাবেশ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি’। সমাবেশ থেকে দাবি আদায়ে সরকারকে আলটিমেটাম দেওয়া হয়।
তাদের ঘোষণা অনুযায়ী- আগামী ১৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চার দফা দাবি পূরণ না করা হলে ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা টানা অনশন কর্মসূচি করবেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌনে ৪ লাখেরও বেশি শিক্ষক কর্মরত। তাদের মধ্যে প্রধান শিক্ষকদের বর্তমান বেতন গ্রেড দশম। আর সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড ১৩তম।