ঢাকা: আসছে বছর রমজানের আগেই অর্থাৎ ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটগ্রহণের টার্গেট নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসি ঘোষিত রোডম্যাপে কর্মপরিকল্পনাগুলো ২৪টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনি আইন ও বিধি সংস্কার এবং অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপের জন্য সেপ্টেম্বর মাস টার্গেট ধরা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও ৩০০ আসনের সীমান চূড়ান্ত করে গেজেট প্রকাশ করতে চায় ইসি। আর নভেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে ডিসেম্বরের শুরুতে তফসিল ঘোষণার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন।
সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। যদিও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে। নির্বাচনের সময়ে আরও ভালো হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবাইকে নিয়ে তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চাই, মানুষ যাতে নির্ভয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। কিন্তু নির্বাচনি রোডম্যাপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যাস্ত করা হয়েছে।
রোডম্যাপে জানানো হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রথম সভা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর তফসিল ঘোষণার ১৫ দিন আগে দ্বিতীয় সভা করবে ইসি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোথায় কত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতয়েন করা হবে তার পরিকল্পনা, সমন্বয় ও দিকনির্দেশনা বিষয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে নির্বাচনি এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের সঙ্গে নিয়োজিত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্বাচনি দায়িত্বপালন সংক্রান্ত দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ হবে।
আর নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তার নেতৃত্বে উপসচিব (নিকস), পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার ও ভিডিপি (উপসচিব/পুলিশ সুপার/পরিচালক/উপপরিচালক পদমর্যাদার), সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর (মেজর/ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার) সদস্য এবং ডাক অধিদফতর, সিভিল অ্যাভিয়েশন, ন্যাশনাল টাস্কফোর্স, সাইবার সিকিউরিটি টাস্কফোর্স, সাইবার রেসপন্স টিম, এনটিএমসি ও অপরাপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় ও মনিটরিং সেল গঠন করা।
কিন্তু নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রিজাইডিং অফিসার— সবাই মিলে যে সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারবে, এ বিশ্বাস ও আস্থা সৃষ্টিও বড় চ্যালেঞ্জ। আর এ জন্য নির্বাচনের মাঠে আইনশৃঙ্খলা সামলানোর দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে না দিয়ে পুরো নিয়ন্ত্রণ ইসির কাছে রাখাই উত্তম বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপে যেসব কাজ নির্ধারণ করেছে সেগুলো মূলত নির্বাচনের আগের কাজ। সময়সীমা অনুযায়ী কাজগুলো ঠিকমতো সম্পন্ন হলে সঠিক সময়ে নির্বাচন করা সহজ হবে। তবে, রোডম্যাপে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব স্বরাষ্ট্রের ওপর ন্যাস্ত করা হয়েছে। এটা কমিশনের হাতে রাখা উচিত ছিল।’
কেন উচিত ছিল?- এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে ভোটারদের নিরাপত্তা, তারা যেন স্বাচ্ছন্দে ভোট কেন্দ্রে আসতে পারেন, নিরাপদ বোধ করেন- এসব দিক দেখতে হবে। আর প্রার্থী ও দলগুলো তাদের প্রচারের সময় যেন কোনো বাধার সম্মুখীন না হয়, বা মবের মুখোমুখি না পড়ে সেটাও ইসিকেই মনিটরিং করতে হবে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্বাচনি পরিবেশ ছেড়ে দিলে হবে না; পুরো নিয়ন্ত্রণ ইসির কাছে রাখতে হবে।’ শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যাবে এবং ভোট দিতে উৎসাহিত হবে বলেও মনে করেন এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ।
ভোটারদের মাঝে এই রোডম্যাপ কতটুকু প্রভাব ফেলবে? এমন প্রশ্নের জবাবে জেসমিন টুলী বলেন, ‘রোডম্যাপ হলো- নির্বাচন যে হবে সেই নির্বাচনের আগে কী কী কাজ করেতে হবে তার তালিকা। সোজা কথা ইসির নির্বাচনি কর্মপরিকল্পনা। সব কাজ গোছানো ও সাজাতে হবে নির্বাচনের আগেই। ফেব্রুয়ারির আগেই যখন ধাপে ধাপে নির্বাচনের কাজ এগিয়ে যাবে, তখন মানুষের মাঝে আস্থার একটা জায়গা তৈরি হবে।’
এদিকে, নির্বাচনি রোডম্যাপে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুস্পষ্ট তারিখ ও সময় উল্লেখ না থাকায় এটাকে পরিপূর্ণ রোডম্যাপ বলছেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ ঘোষণা রাজনৈতিক। এবং এটি নির্বাচনের জন্য খুব ইতিবাচক একটি দিক। এর ফলে নির্বাচনকে ঘিরে যে একটা সন্দেহ দানা বেঁধেছিল তার অবসান ঘটল।’
এখন ইসির দায়িত্ব্ রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচনি কাজ এগিয়ে নেওয়া। এতে প্রার্থী ও ভোটারদের মাঝে আস্থা ফিরবে এবং নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক।