রাজবাড়ী: রাজবাড়ীর ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালসহ উপজেলা হাসপাতালগুলোতে সরকার থেকে বিনামূল্যে সরবরাহকৃত জলাতঙ্ক টিকার প্রকট সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যের এ টিকার সরবরাহ না থাকায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত রোগীরা দুর্ভোগে পড়েছেন। আবার টাকা দিয়েও ফার্মেসী থেকে পাওয়া যাচ্ছে না টিকা। যারা বাইরে থেকে এনে এই টিকা বিক্রি করছেন, সেগুলো অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন টিকা নিতে আসা রোগীরা।
রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২২০ জন মানুষকে বিনামূল্যে জলাতঙ্কের টিকা ‘র্যাবিস ভ্যাকসিন’ দেওয়া হয়। এছাড়াও প্রত্যেক মাসে গড়ে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মানুষ সদর হাসপাতাল থেকে জলাতঙ্কের টিকা ‘র্যাবিস ভ্যাকসিন’ নিয়ে থাকে। কিন্তু গত ১৩ই ডিসেম্বর থেকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ‘র্যাবিস ভ্যাকসিন’ সরবরাহ নেই। জেলা শহরসহ উপজেলা শহরগুলোতে প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সী মানুষ কুকুর, বিড়াল, ইঁদুর, শিয়ালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর কামড়ে আক্রান্ত হচ্ছে।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, দ্বিতীয় তলায় জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন দেওয়ার ২০৩ নম্বর কক্ষের দরজায় সাদা কাগজে বেশ বড় করে লেখা রয়েছে ‘গত ১৩/১২/২০২৫ তারিখ থেকে র্যাবিস ভ্যাকসিন সাপ্লাই নেই’। দেখা যায়, সকাল থেকেই জেলা শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রোগীরা জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে আসছে। কিন্তু, হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকায় অনেকে ফিরে যাচ্ছে। আবার অনেকে বাইরে থেকে বেশি দাম দিয়ে সংগ্রহ করে চারজনের গ্রুপ করে তারা ভ্যাকসিন নিচ্ছেন।
পাংশা থেকে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে এসেছে মো. আল আমিন শেখ। তিনি বলেন, ‘আমার আজ তৃতীয় ডোজের নির্ধারিত তারিখ ছিল। হাসপাতালে এসে দেখি ভ্যাকসিনের সরবরাহ নেই। আবার বাইরে থেকে টাকা দিয়েও ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের ভ্যাকসিন ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা দাম দিয়ে বাইরে কিনে নিয়েছিলাম। ১টি ভ্যাকসিন চারজন নেওয়া যায়।’
চঞ্চল মিয়া নামের এক রোগী বলেন, ‘আমাকে বিড়ালে কামড়েছিল, তাই ভ্যাকসিন নিতে এসেছি আজ। ভ্যাকসিনের সাপ্লাই ছিল না বলে আগের দুইটা কিনে নিতে হয়েছিল। এবারো এসেছি ভ্যাকসিন নিতে, কিন্তু টাকা দিয়েও পাচ্ছি না।’
মেয়েকে নিয়ে গোয়ালন্দ থেকে সোনিয়া আক্তার নামের এক নারী এসেছেন ভ্যাকসিন নিতে। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে কুকুরে আঁচড় দিয়েছিল। প্রথম ডোজ সংগ্রহ করে দিয়েছিলাম, কিন্তু দ্বিতীয় ডোজ কোথাও পাচ্ছি না। গোয়ালন্দ হাসপাতালে না পেয়ে সদর হাসপাতালে এসেছিলাম ভ্যাকসিন নিতে। কিন্তু, এখানে এসেও দেখি নেই।‘
রাজবাড়ী দাদশী ইউনিয়নের বাসিন্দা কৃষ্ণ কুমার হালদার বলেন, ‘ছেলেকে কুকুরে কামড় দিয়েছে। গতকাল রাত ৯টা ১০টা পর্যন্ত ওষুধের দোকানগুলোতে ভ্যাকসিন খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। আজ হাসপাতালে এসেও ভ্যাকসিন পেলাম না। এখন কি করব বুঝতে পারছি না ‘
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের র্যাবিস টিকাদান কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ইনচার্জ শিরিনা খাতুন বলেন, ‘ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ থেকে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন সাপ্লাই নেই। প্রতিদিন সদর হাসপাতাল ১৫০ থেকে ২০০ মানুষকে দেওয়া হয়। গত মাসে আমাদের ভ্যাকসিন এসেছিল ৫০০ পিস। প্রতিদিন যদি ২০০ মানুষকে দেওয়া হয় তাহলে ৫০০ ভ্যাকসিন ১০-১২ দিন যায়। আমরা চাহিদা জানিয়েছি। কিন্তু, ঢাকা থেকে সরবরাহ করছে না। ঢাকা থেকে সরবরাহ না করলে আমরাও বিনামূল্যে রোগীদের দিতে পারছি না।‘
এ বিষয়ে রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালের সামনে থাকা ওষুধ বিক্রেতা হারুন ও শামীম শেখ বলেন, ‘এই র্যাবিস ভ্যাকসিন আমাদের এখানে দুইটি কোম্পানি সাপ্লাই করে থাকে ইনসেপ্টা ও পপুলার। ২০ দিন আগে ৫ পিস দিয়েছিল। এরপর আর এক পিসও দেয়নি। এজন্য আমাদের দোকানগুলোতেও র্যাবিস ভ্যাকসিন সংকট দেখা দিয়েছে। কোম্পানির কাছে চাইলেও তারা ভ্যাকসিন দিতে পারছে না। এই ভ্যাকসিনের এমআরপি দেওয়া ৫০০ টাকা। বেশি দাম নেওয়ার সুযোগ নেই। আর এটি স্টক করা জিনিসও না যে আমরা রেখে দেব।’
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সারাদেশেই টিকা সংকট। আমরা চাহিদা জানিয়েছি। স্টোরে টিকা নেই। কবে নাগাদ আসবে সেটাও বলতে পারছি না। টিকা আসা মাত্রই রোগীরা পাবে ‘
রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ বলেন, ‘উপজেলা হাসপাতালে আমরা আগে যে ভ্যাকসিন পেতাম তা ঢাকা থেকে সরবরাহ বন্ধ আছে। সদর হাসপাতালে সরবরাহ থাকলেও তার ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা ভ্যাকসিনের ব্যাপারে যোগাযোগ করছি। ভ্যাকসিন আসলে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে দেওয়া হবে।’