রংপুর: রংপুর সিটি করপোরেশনের ১ হাজার ৪২৮ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৯৬৫ কিলোমিটারই কাঁচা ও খানাখন্দে ভরা—যা মোট সড়কের অর্ধেকেরও বেশি। বর্ষা এলে এসব সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে, আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালুতে নাভিশ্বাস ওঠে নগরবাসীর।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ায় এই দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়েছে। নগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ১৮টিতে এখনো গ্রামীণ পরিবেশ বিরাজমান—যেখানে সরু, কাঁচা রাস্তা ও জলাবদ্ধতা নিত্যদিনের সঙ্গী।

১৩ বছরেও রসিকের কাঁচা সড়কের বোঝা কাটেনি
১৮৬৯ সালে পৌরসভা হিসেবে যাত্রা শুরু করা রংপুর ২০১২ সালে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। তখন আয়তন ছিল ৫০.৬৬ বর্গকিলোমিটার। পরবর্তীতে সাতটি ইউনিয়ন যুক্ত হয়ে আয়তন বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২০৫ বর্গকিলোমিটারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর পার হলেও সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে এখনো প্রায় ৫০৫ কিলোমিটার সড়ক পুরোপুরি কাঁচা।

এ ছাড়া অন্তত ৩৪০ কিলোমিটার সড়ক মেরামত ও প্রশস্তকরণ প্রয়োজন, ২৫০ কিলোমিটার আরসিসি নালা এবং প্রায় ৩০টি ছোট-বড় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের দাবি রয়েছে। এসব অবকাঠামো ঘাটতির কারণে বর্ষাকালে নগরীর বড় অংশ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ফাইলবন্দি ১৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প
২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, নগরীর সড়ক পরিস্থিতি ভয়াবহ। হিসাব অনুযায়ী সড়ক, নালা ও সেতু-কালভার্ট নির্মাণে প্রয়োজন ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা।

তার ভাষায়, ‘সড়ক ও ড্রেনেজ উন্নয়নে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। জরুরি মেরামতের জন্য আরও ২১০ কোটি টাকার প্রকল্পও তালিকাভুক্ত, কিন্তু একনেকের বৈঠক না হওয়ায় সবকিছুই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের জন্য ঝুলে আছে।’
ফলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প এখনো ফাইলবন্দি। ২০২৫ সালজুড়ে একনেকে রংপুর অঞ্চলের কিছু প্রকল্প অনুমোদন পেলেও সিটি করপোরেশনের সড়কসংক্রান্ত বড় কোনো প্রকল্প ছাড় পায়নি।
১৮ ওয়ার্ডে বেহাল দশা, বর্ষায় অচল নগর
বর্ধিত ১৮টি ওয়ার্ডে সড়কের বেহাল দশা সবচেয়ে প্রকট। কেল্লাবন্দ, বানিয়াপাড়া, বসুনিয়াপাড়া, কদমতলা, সুকান চকি, মনোহর, অভিরাম, গোয়ালু, পার্কের মোড়, চকবাজার, লালবাগ ও পান্ডারদিঘীসহ বহু এলাকায় খানাখন্দে ভরা সড়কে নিয়মিত দুর্ঘটনা ও যানজট লেগেই থাকে।

৩৩ নম্বর ওয়ার্ড রঘুবাজারের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘অটোরিকশায় উঠলে শরীর দুলে যায়। অসুস্থ মানুষ চলাচল করতে পারে না। বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকে, তখন ভাড়া আরও বাড়ে।’
গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও বছরের পর বছর সংস্কার নেই
সরেজমিনে দেখা গেছে, জাহাজ কোম্পানি থেকে সাতমাথা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি—যা কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে—দেড় বছরের বেশি সময় ধরে খানাখন্দে ভরা। এ নিয়ে একাধিকবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে।

সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আজম আলী জানান, কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি প্রকল্পের আওতায় ২৪ কোটি টাকায় সড়কটি সংস্কারের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যা এখনো মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি না থাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে। জরুরি সিদ্ধান্ত না নিলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে শহরের বড় অংশ কার্যত চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়বে।’
সাবেক কাউন্সিলর আশেক আলী বলেন, ‘কিছু এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ারও উপায় নেই। স্থানীয় উদ্যোগে মাটি ফেলে কোনোভাবে চলাচল চালু রাখা হয়েছে।’
বরাদ্দ বৈষম্যের অভিযোগ
সিটি করপোরেশনের সাবেক (অপসারিত) মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা অভিযোগ করেন,
‘পূর্ববর্তী সরকার রংপুরের সঙ্গে বৈষম্য করেছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশন যেখানে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে, রংপুর সেখানে পেয়েছে মাত্র ২১০ কোটি।’
হতাশার মধ্যে আশার আলো
এই হতাশার মধ্যেই ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর প্রকাশিত হয় ‘রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ-২০২৫’। এর মাধ্যমে গঠিত হয় রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ।
এই কর্তৃপক্ষের আওতায় রংপুর সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, পীরগাছা ও মিঠাপুকুর অন্তর্ভুক্ত হবে। মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে পরিকল্পিত নগরায়ন, সড়ক ও জলাশয় সংরক্ষণ, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং সবুজায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় রোডের বাসিন্দা রাতু রুমানা চৌধুরী স্নেহা বলেন, ‘দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন না হলে দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তবে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন ভবিষ্যতের জন্য অন্তত একটি আশার আলো।’