ইরানে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলমান নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ গত বুধবার থেকে তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে এখন স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে সরকার পতনের ডাক। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে উচ্চারিত হচ্ছে—‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) পৃথক বিবৃতিতে ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে সম্প্রচারিত আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, গত দুই রাতে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ঘাঁটি দখলের চেষ্টা চালিয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বা নিরাপত্তা কাঠামোর ক্ষতি করার যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে। আইআরজিসি জানায়, ‘রাষ্ট্র ও ইসলামী বিপ্লবের নিরাপত্তাই আমাদের রেড লাইন।’
পৃথক এক বার্তায় ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনীও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ‘জানবাজ লড়াই’-এর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
প্রতিবাদ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ডিসেম্বর, যখন রাজধানী তেহরানে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে ধর্মঘট শুরু করেন। ক্রমাগত উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ইরানি রিয়ালের দরপতন এবং অসহনীয় জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দেয়। মাত্র ১৩ দিনের ব্যবধানে এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহরে, কার্যত অচল হয়ে পড়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
বিক্ষোভ দমনে গতকাল থেকেই দেশজুড়ে ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছে সরকার। মার্কিন সাময়িকী টাইম-এর তথ্যমতে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে এ পর্যন্ত অন্তত ২০০ জন নিহত হয়েছেন।
এদিকে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প একাধিকবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি কঠোর হাতে আন্দোলন দমন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক অভিযানে যেতে দ্বিধা করবে না।
একদিকে সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের ‘রেড লাইন’ ঘোষণা, অন্যদিকে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য হুমকি—সব মিলিয়ে ইরান এখন এক চরম অনিশ্চয়তা ও বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।