ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষা। এই পরীক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে ‘জুলাই সনদ’ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে প্রস্তাবিত গণভোট। দেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দল বিএনপি এই প্রশ্নে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও দলের অভ্যন্তরে দানা বেঁধেছে এক গভীর বিরোধ। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ‘না’ ভোটের প্রচারণা দলটির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতাকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে। বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ দ্বিধাবিভক্তি কি কেবলি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণ?
‘হ্যাঁ’ ভোটের নৈতিক অবস্থান
গত ২২ জানুয়ারি সিলেটের পুণ্যভূমি থেকে নির্বাচনী প্রচারণার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন তারেক রহমান। তবে গত ৩০ জানুয়ারি শুক্রবার রংপুরের জনসভায় তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় এক নতুন রাজনৈতিক বার্তা। জুলাই বিপ্লবের বীর আবু সাঈদ ও চট্টগ্রামের ওয়াসিমের আত্মত্যাগের উদাহরণ টেনে তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য।
তারেক রহমানের এই আহ্বানের পেছনে সুনির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘জুলাই সনদ’ কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি ছাত্র-জনতার বিপ্লবের এক নৈতিক স্বীকৃতি। ধানের শীষের পাশাপাশি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে রায় দেওয়াকে তিনি শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখছেন। তার এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে এবং দেশের সুশীল সমাজে বিএনপিকে একটি ‘সংস্কারপন্থী ও আধুনিক’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
গত ২২ জানুয়ারি সিলেটে নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনের পর রংপুরের জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আহ্বান জানান, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন বিএনপি একটি আধুনিক ও সংস্কারপন্থী দল হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠন করতে চাইছে। তারেক রহমানের এই আহ্বানের পেছনে মূল যুক্তি ছিল- ‘শহীদদের রক্তের ঋণ’। তিনি স্পষ্ট করেছেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা মানে কেবল কাগজের একটি দলিলে সম্মতি দেওয়া নয়, বরং যারা জীবন দিয়েছেন তাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র বিনির্মাণে অংশীদার হওয়া।
দল ও কেন্দ্রের সংহতি
দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এই বার্তা বারবার নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান স্পষ্ট করে বলেছেন, সংস্কারের দাবি বিএনপিই প্রথম তুলেছিল, তাই গণভোটে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
একই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিনও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপির সামগ্রিক অবস্থান ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষেই। এই অবস্থান থেকে এটা স্পষ্ট যে, বিএনপি রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি রাষ্ট্র সংস্কারের বৌদ্ধিক লড়াইয়েও অংশীদার হতে চায়।
‘না’ ভোটের ভিন্ন সমীকরণ
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান-এর ফেসবুক পোস্ট রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। তাঁর মতে, ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া মানে হলো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য লাইসেন্স দেওয়া। মাঠপর্যায়ের এই নেতার ভয়, সংস্কারের নামে নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ যদি আরও ছয় মাস বা এক বছর পিছিয়ে যায়, তবে বিএনপির দীর্ঘ দেড় দশকের ত্যাগের ফসল অন্য কেউ ঘরে তুলবে।
একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এমদাদুল হক মুকুল-এর কণ্ঠেও। তাদের এই ‘না’ ভোট মিশন কেবল ব্যক্তিগত কোনো ক্ষোভ নয়, বরং এটি তৃণমূলের একটি বড় অংশের মনের আশঙ্কার প্রতিফলন। তারা মনে করছেন, দ্রুত নির্বাচনই দলটির বর্তমান প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, আর গণভোটের এই ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নির্বাচন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার আইনি সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নমনীয়তা নাকি সাংগঠনিক দুর্বলতা
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ এ বিষয়টিকে ‘ব্যক্তিগত অভিমত’ বা ‘বুঝতে ভুল’ হিসেবে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
তিনি জানান,‘‘যেসব নেতারা ‘‘না’’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, এটা তাদের ব্যক্তিগত অভিমত। আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘হ্যাঁ’- ভোটকে সমর্থন দিতে আহ্বান জানিয়েছেন, সেটা পুরো দেশ ও পুরা জাতি মিডিয়াতে দেখেছে ও শুনেছে। তাই অন্যরা কী বলছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নয়।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘দলের নির্দেশ না মানা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য অনেক নেতা কর্মীকেই আমরা অস্থায়ী ও স্থায়ীভাবে দল থেকে অব্যাহতি দিয়েছি। কিন্তু ‘না’ ভোটের প্রচারণাকারীদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যেহেতু সংখ্যাটা খুবই কম। একজন বা দুজন হয়তো বলেছে এবং সেটা দলীয় সিদ্ধান্তের আগে বলেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি। আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখবো বিষয়টা।
শেষকথা
বিএনপির ভেতরে ‘না’ ভোটের যে সুর ধ্বনিত হচ্ছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো; তৃণমূলের এই নেতারা তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছিলেন তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক আহ্বানের পূর্বে। ফলে একে সরাসরি ‘বিদ্রোহ’ না বলে বরং দ্রুত নির্বাচনের জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক চাপ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে এখন যেহেতু দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘হ্যাঁ’ ভোটের স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে, তাই মাঠের এই ভিন্নমত কি আনুগত্যের জোয়ারে মিশে যাবে, নাকি তলে তলে এক গভীর ফাটল সৃষ্টি করবে – সেটাই দেখার বিষয়।