বরিশাল: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা বেকার ভাতা দিয়ে কাউকে বেইজ্জত করতে চাই না। আমরা যুবকদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। আর নারী জাতি আমাদের মা। তাদের ইজ্জতের শতভাগ গ্যারান্টি, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই থামবে না।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, রাঘব বোয়াল, গডফাদার, মাফিয়া এরা থাকবে আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর ওই যারা ছিঁচকে চোর তাদেরকে আনবেন আপনি আইনের আওতায় শাস্তি দেবেন; এটা চরম অন্যায়। দুর্নীতির মূলোৎপাটনে শুধু ওপরের অংশ নয়, শেকড়ে হাত দেওয়া হবে। আমরা দুর্নীতির পাতা আর ডাল ধরে টান দেব না, আমরা দুর্নীতির ঘাড় ধরে টান দেব ইনশাআল্লাহ। আমরা অঙ্গীকার করেছি, আল্লাহ যদি আমাদেরকে দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন, আমরা নিজেরা চাঁদাবাজি করব না, করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না এবং কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না।
জনসভায় তিনি বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক, বিমা ও মেগা প্রজেক্টের নামে জনগণের টাকা লুট করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতেই বিদেশে পাচার হয়েছে ২৮ লাখ কোটি টাকা, যা দেশের চারটি বাজেটের সমান। লুণ্ঠন ও পাচারের সাথে যারা জড়িত, তারা জীবনেও এই টাকা ফেরত আনতে চাইবে না। আমরা কথা দিচ্ছি, এই টাকা ১৮ কোটি মানুষের টাকা। আমরা চূড়ান্ত লড়াই করব এই টাকা ফেরত আনার জন্য।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী দেশের সবচেয়ে বড় মজলুম দল। জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে দলের ১১ জন শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো বিশ্ববিখ্যাত মুফাসসিরে কুরআনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। হাজার হাজার কর্মীকে হত্যা ও ৫ হাজার সহকর্মীকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। সাড়ে ১৩ বছর আমাদের অফিসগুলো বন্ধ ছিল এবং শেষমেশ দল ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকার বিদায়ের পর আমরা ঘোষণা করেছি, দলের পক্ষ থেকে আমরা কারো বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নেব না। তবে শহিদ পরিবার ও ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা তাদের আইনি সহায়তা দেব।
এসময় তিনি মিথ্যা মামলা ও মামলা বাণিজ্যের বিরুদ্ধেও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি।বলেন, মামলা রুজু করতে গিয়ে একজন নিরপরাধ মানুষের নাম অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে একটা মানুষের নাম লেখা যাবে না। সারা বাংলাদেশে আমরা হাজার হাজার মামলা করি নাই। এত মামলা করলে কেয়ামত এসে যাবে কিন্তু বিচার শেষ হবে না। আমাদের মামলায় শুনে অবাক হবেন, আটটা মামলা আছে দেশে, আসামি মাত্র একজন করে। আমরা দ্বিতীয় লোক খুঁজে পাইনি তার নাম সেখানে লিখবো কেন? কিন্তু এখানেই আমরা দেখলাম আশ্চর্য হয়ে, কেউ কেউ মামলা করেছেন আটশো-নয়শো আসামি, তারপরে আরো অজ্ঞাত আছে। এই মামলা করার অনেকে বাণিজ্য করছে।
তিনি আরও বলেন, নিরীহ মানুষ যে কোন অপরাধে ছিল না হয়তো কোন দল সমর্থন করেছে, এতোটুকুর জন্য তার নাম দিয়ে তার কাছ থেকে এখন খাজনাপাতি আদায় করা হচ্ছে। মনে রাখবেন দিন শেষে ওই মানুষগুলোর কাছে সবার কাছে আপনাকে আমাকে যেতে হবে। আপনি রাজনীতি করেন আপনি জনগণকে উপেক্ষা করে চলতে পারবেন না।
বরিশাল অঞ্চলের নদী ভাঙন সমস্যা নিয়ে তিনি বলেন, নদী শাসন নয়, নদী সংস্কার প্রয়োজন। নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। বাজেট লুটপাট না করে সঠিকভাবে বাঁধ নির্মাণ ও নদী সংস্কার করলে ১০ বছরে এই অঞ্চলের দৃশ্যপট পালটে যাবে।
জনসভায় তিনি দলীয় বিজয়ের চেয়ে জনগণের বিজয়কে প্রাধান্য দিয়ে বলেন, আমরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আমরা এমন এক নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না, সরকারি দল ও বিরোধী দলের জন্য আলাদা বিচার হবে না। রাষ্ট্রপতি থেকে সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে সবাই একই বিচারের আওতায় আসবে।
জনসভা শেষে ডা. শফিকুর রহমান বরিশাল-১ আসনে মাওলানা কামরুল ইসলাম খান, বরিশাল-২ আসনে আব্দুল মান্নান, বরিশাল-৩ আসনে ব্যারিস্টার ফুয়াদ, বরিশাল-৪ আসনে অধ্যাপক মাওলানা আব্দুস জব্বার এবং বরিশাল-৬ আসনে মাওলানা মোহাম্মদ মাহমুদুন নবী তালুকদারের হাতে দলীয় প্রতীক তুলে দেন।
জনসভায় মেহেন্দিগঞ্জের স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে বিশাল জনসমাগম হয়। এতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ ১১ দলীয় জোটের শরিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।