Saturday 07 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

প্যারেন্ট স্টক আমদানিতে শর্তারোপে সিন্ডিকেটের আশঙ্কা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:৪৫ | আপডেট: ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:০০

– ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত

ঢাকা: ‘জাতীয় পোল্ট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬’ চূড়ান্ত হলে দেশের প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার পোল্ট্রি শিল্প ধীরে ধীরে সীমিত কয়েকটি বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ও সিন্ডিকেটে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশের পোল্ট্রি খামারিরা।

তারা বলছেন, নতুন নীতিমালায় মুরগির প্যারেন্ট স্টক আমদানিতে শর্তারোপ ও বিধি-নিষেধ যুক্ত করায় বাজারে প্রতিযোগিতা কমে উৎপাদন ব্যাহত হয়ে ভোক্তা পর্যায়ে ডিম ও মুরগীর মাংসের মূল্যে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

উল্লেখ্য,  গত ২২ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘জাতীয় পোল্ট্রি নীতিমালা ২০২৬’- এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ধাপে ধাপে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই এ শর্তারোপ করা হয়েছে। বাস্তব উৎপাদন কাঠামো, বাজারের বিদ্যমান সক্ষমতা এবং পরিবেশ ও রোগবালাই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিলে ভালো উদ্দেশ্য থেকেও অপ্রত্যাশিত নেতিবাচক ফল আসতে পারে বলে জানান খাত সংশ্লিষ্টরা।

খসড়া নীতিমালার ৫.৮.১.২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কেবলমাত্র একদিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং একদিনের বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্ট স্টক বাচ্চা আমদানি করা যাবে। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ক্ষেত্রবিশেষ’ বলতে কোন পরিস্থিতিতে সংকট বিবেচিত হবে এবং কোন ধরনের প্যারেন্ট স্টকের (ব্রয়লার, লেয়ার, কালার বার্ড) আওতায় পড়বে তা নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, এই অস্পষ্টতাই পোল্ট্রি শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশে বাণিজ্যিকভাবে ব্রয়লার, লেয়ার ও কালার বার্ড উৎপাদন হয়। এর মধ্যে লেয়ার ও কালার বার্ডের প্যারেন্ট স্টক প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিদেশ থেকে আমদানিনির্ভর। অন্যদিকে ব্রয়লারের ক্ষেত্রে প্যারেন্ট স্টক উৎপাদনের জন্য প্রাণীসম্পদ অধিদফতরে ১৯টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে একই মালিকানার (গ্রুপ অব কোম্পানিজ) একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আবার নিবন্ধিত অনেক প্যারেন্ট স্টক ফার্ম নিজস্বভাবে উৎপাদন না করে বড় বড় কোম্পানির কাছে ভাড়া দিয়েছে। ফলে ঘুরেফিরে ৫ থেকে ৬টি কর্পোরেট বড় গ্রুপের হাতেই প্যারেন্ট স্টক ফার্ম কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে এবং তারাই চাহিদার সিংহভাগ প্যারেন্ট স্টক বাচ্চা দেশের ব্রিডার ফার্ম গুলোকে সরবরাহ করে। এই কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকেই প্যারেন্ট স্টক কিনে দেশের তিন শতাধিক ব্রিডার ফার্ম একদিন বয়সী বাণিজ্যিক বাচ্চা উৎপাদন করে। ফলে এই সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের কোনো একটিতে রোগবালাই, উৎপাদন বিঘ্ন বা ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা দেখা দিলে এবং উৎপাদন হ্রাস পেলে সারাদেশেই প্যারেন্ট স্টকের মারাত্মক সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে। আবার যদি এসব প্রতিষ্ঠান তাদের নির্ধারিত দামে প্যারেন্ট স্টক বিক্রি করতে চায়, তাহলে ব্রিডার ফার্মগুলোর সামনে কার্যত কোনো বিকল্প থাকবে না। পাশাপাশি বড় ওই কয়েকটি কর্পোরেট কোম্পানির সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ থাকবে। এতে হ্যাচারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য হয়েই ওই বড় কোম্পানির দেওয়া দামেই কিনতে হবে এবং প্যারেন্ট স্টক অথবা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশে মুরগি ও ডিম উৎপাদন হ্রাস পাবে এবং ভোক্তা সাধারণ ও প্রান্তিক পোল্ট্রি খামারিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

খামারি ও খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্যারেন্ট স্টক আমদানির প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। হঠাৎ করে বা জরুরি প্রয়োজনে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা সম্ভব নয়; পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগে, আবার এই প্যারেন্টস্টক বাচ্চা ফার্মে তোলার পরে লালনপালন করে হ্যাচিং ডিম উৎপাদন ও সেই ডিম থেকে একদিন বয়সী বাচ্চা ফুটে বাজারে আসতে সময় লাগবে প্রায় ৭/৮ মাস। সবমিলিয়ে সংকট সৃষ্টি হলে তা সমাধানে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে। তাই প্যারেন্ট স্টক বাচ্চা আমদানির পথ সংকুচিত করলে সংকট মোকাবিলা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশে কোন প্রতিষ্ঠান কত পরিমাণ প্যারেন্ট স্টক উৎপাদন করছে সে বিষয়ে কোনো বাধ্যতামূলক ও স্বচ্ছ রিপোর্টিং ব্যবস্থা নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদফতর মূলত গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি অনুমানভিত্তিক চিত্র দাঁড় করিয়েছে। উৎপাদন, মজুদ ও বাজারে সরবরাহের সঠিক ও হালনাগাদ তথ্য ছাড়া কেবল আমদানির পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক আমদানি ধারাবাহিকভাবে কমে এসেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে আমদানি ছিল ২৪ লাখ, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নেমে এসেছে ১১ লাখে।

এবিষয়ে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্তে খামারিদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মনে রাখতে হবে পোল্ট্রি শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে যেকোনো সিদ্ধান্তে এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যে, খামারিরা সময়মতো এবং ন্যায্য দামে বাচ্চা কিনতে পরছেন।

প্রানীসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, গত বছর ২০২৫ সালে লেয়ার, সোনালি, কালার বার্ড ও ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক আমদানি হয়েছে ২১ লাখ ৫২ হাজার। এর মধ্যে ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক আমদানি হয়েছে ১১ লাখ। আর মোট প্যারেন্ট স্টক উৎপাদন হয়েছে ৮২ লাখ। দেশে সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ প্যারেন্ট স্টক উৎপাদনের। আর দেশে সব ধরনের মুরগির প্যারেন্ট স্টকের চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ। এতে প্যারেন্ট স্টক উৎপাদনের সক্ষমতা যদি ৮৭। এ ক্ষেত্রে আমদানি করতে হয় প্রায় ১৬ লাখ প্যারেন্ট স্টক। এর মধ্যে ব্রয়লারের প্যারেন্ট স্টক উৎপাদনে ইতোমধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হয়েছে।

এবিষয়ে খামারি, উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা বলেন, এখনো যেহেতু শতভাগ প্যারেন্ট স্টক উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়নি, তাই আমদানিতে কোনো বিধিনিষেধ দেয়া উচিত হবে না। প্যারেন্ট স্টক আমদানি উন্মুক্ত রাখাই উচিত। কেননা প্রায় ১৬ লাখ প্যারেন্ট স্টক উৎপাদনের সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি দেশে।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাচ্চা আমদানিতে কিছুটা কড়াকড়ি থাকা উচিত। তবে সীমিত পরিসরে হলেও ঘাটতি পূরণে আমদানির সুযোগ রাখতে হবে। যারা বাচ্চা উৎপাদন ও বিপণন করে তাদের জন্য প্যারেন্ট স্টকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো আমদানির সুযোগ রাখতে হবে। নতুন হ্যাচারি বাজারে এলে তারাও এ সুযোগ পাবে। তবে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা ঠিক হবে না।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক (উৎপাদন) এবিএম খালেদুজ্জামান বলেন, সামগ্রিক পোল্ট্রি খাতের উন্নয়ন যেন হয়, সেই আলোকেই নীতিমালাটির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে দেশের পোল্ট্রি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর