Sunday 08 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘রাজনৈতিক দলের লাগাম টানতে না পারলে কোনো ইশতেহারই টিকবে না’

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:১৪ | আপডেট: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪০

ঢাকা: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, রাজনৈতিক দলের লাগাম টানতে না পারলে কোনো ইশতেহার টিকবে না। কোনো না কোনো জায়গায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকে। এটা না থাকলে সব সম্ভব। রাজনৈতিক প্রভাব থেকে স্তর মুক্ত থাকা দরকার।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০২৬ ইশতেহার পর্যালোচনা: পরিকল্পনা, নগরায়ণ ও টেকসই উন্নয়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করা লাগবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশাজীবীদের বাদ দিয়ে আমলা নির্ভর হয়ে গেছে। সেই জায়গাতে আমলাতন্ত্রকে কিভাবে সাজাবেন, এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য সেই জায়গাটা নিয়ে স্পষ্ট কিছু নাই। যতগুলো টেকনিক্যাল প্রতিষ্ঠান আছে সেখানে যদি অ্যাডমিনের কাউকে বসিয়ে দেন তাহলে তো সেটা চলবে না। সেটা যদি সংস্থার না হয় তাহলে কোনোভাবে চেঞ্জ করতে পারবেন না। সেই অঙ্গীকারগুলো অনুপস্থিত। সে অঙ্গীকার যদি না থাকে তাহলে আমরা কিভাবে বুঝতে পারব আপনাদের যে অঙ্গীকার সেটার মাধ্যমে কিভাবে পরবর্তী করবেন।

বিজ্ঞাপন

গণপরিবহনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি গণপরিবহনের কথাগুলো এসেছে বিশেষ করে মেট্রোরেল মনোরেল বিতর্কগুলো কিন্তু গণমাধ্যমে এসেছে। এটা আসলে বিতর্কের কিছু না। কোথায় মেট্রোরেল লাগবে, কোথাও মনোরেল লাগবে, কোথাও পাতাল রেল লাগবে, আবার কোথাও বাস লাগবে। বরং আপনি পারসেন্টেজ অফ ম্যাস ট্রান্সপোর্টেশন যে শেয়ার সেটাকে আপনি কিভাবে ডিস্ট্রিবিউট করবেন, তার একটা টার্গেট সেট করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, এটা ভালো দিকে যে বিভিন্ন দল তাদের নির্বাচনি ক্যাম্পেইনে অনেক ক্ষেত্রে নেতারা মুভমেন্টে বাস ব্যবহার করছে। এটাকে কিন্তু আমরা সাধুবাদ জানাতে চাই। কেননা বড় নেতারা যদি বাস ব্যবহার করেন, আর এভাবে সবাই যদি করে তাহলে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমে যাবে। তবে দলগুলোর ইস্তেহারগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কথা উঠে আসেনি। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ না করলে আপনি শুধুমাত্র গণপরিবহন বাড়ালেই হবে না। প্রতিদিন ব্যক্তিগত গাড়ি বাড়ছে। তাহলে সেই নিয়ন্ত্রনের কথা তো আসতে হবে। সকল ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ছাড়া রাষ্ট্র চলে না। ঢাকা ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোলের আপনার পলিসিটা কি?

তিনি আরও বলেন, ঢাকা ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোল ম্যানেজমেন্টের সুস্পষ্ট পলিসি। যেটা সাম্প্রতিক সময় আমরা দেখেছি ড্যাপের যে নিয়ম কানুন চেঞ্জ করছে, কারা চেঞ্জ করছে? বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা। সে ব্যবসায়ীরা গিয়ে তারা কি করছে আইন পলিসি চেঞ্জ করছে এবং আপনি দেখবেন এবার যারা মনোনয়ন পেয়েছে অধিকাংশ ব্যবসায়ী এবং একটা বড় অংশ বিএনপির। ব্যবসায়ী দিয়ে যে পার্লামেন্ট আসবে, সেই পার্লামেন্ট জনকল্যাণমুখী দেশ তৈরি করবে এটা হয়নি। কারণ ব্যবসার ধর্ম হচ্ছে প্রফিট, সে দেশ বোঝে না, সে বলছে তার ব্যবসা গতিটা ম্যাক্সিমাইজ করতে হবে। তাহলে এই যে দলগুলো তাদের মধ্যে ঋণ খেলাপি যারা আছে, ঋণ খেলাপি নিয়ে আপনি কিভাবে দেশ বদলাবেন? তাহলে এই যে ব্যবসায়ীরা এখন কি হচ্ছে?

বিআইপির বর্তমান সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সমগ্র বাংলাদেশের স্থানিক পরিকল্পনা আগে চাই। অঞ্চল ভিত্তিক পরিকল্পনায় আমরা জোর দিতে চাচ্ছি।’ এ সময় তিনি রাজনীতিক দলগুলোর ইশতেহার নিয়ে আলোচনা করেন এবং নির্বাচন পরবর্তী সরকারি দলের জন্য ১০টি সুপারিশ প্রস্তাবনা করেন।

সুপারিশগুলো হলো :

১. পরিকল্পিত নগরায়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনা: সমগ্র দেশের স্থানিক ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। কৃষিজমি সংরক্ষণ ও অনিয়ন্ত্রিত গ্রামীণ বসতি বিস্তার নিয়ন্ত্রণ, মাস্টারপ্ল্যানকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনা এবং জাতীয় নগরনীতি ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন।

২. বিশেষায়িত এলাকা: জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, হাওর, চর, পাহাড়ি ও দ্বীপাঞ্চলের মতো সংবেদনশীল এলাকার জন্য পৃথক ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন। সব মেগা ও বিশেষ প্রকল্পের জন্য বাধ্যতামূলক পরিকল্পনা, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন অপরিহার্য করা। নদী, বন, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অগ্রাধিকার দেওয়া।

৩. স্তরভিত্তিক পরিকল্পনা: জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তার ভিত্তিতে আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা তৈরি ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। পরিকল্পিত শিল্প অঞ্চল ও ইকোনমিক জোন গড়ে তুলতে হবে। এসব শিল্পাঞ্চলে থাকবে শ্রমিকবান্ধব আবাসন, পরিবহন ও স্বাস্থ্যসেবা।

৪. বসবাসযোগ্য ও সাশ্রয়ী আবাসন: নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন উদ্যোগ, ভাড়াভিত্তিক ও সরকারি জমিতে সামাজিক আবাসন ব্যবস্থা, বস্তি উন্নয়ন ও পুনর্বাসন এবং খোলা স্থান, পার্ক ও খেলার মাঠ সংরক্ষণ। গ্রামীণ এলাকায় মানসম্মত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য ভূমি ও অর্থের সংস্থান বাড়ানো প্রয়োজন, পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগকে প্রসারিত করতে হবে।

৫. নাগরিক সেবা ও নগর সুবিধা: নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন; বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে নিরবচ্ছিন্নতা ও জবাবদিহিতা; সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় বৃদ্ধি এবং নাগরিক সেবায় দুর্নীতি ও হয়রানি হ্রাস। খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ, বিনামূল্যে ও মানসম্মত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা।

৬. পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীল শহর: নদী, খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ; বায়ু, শব্দ ও পানি দূষণ নিয়ন্ত্রণ; জলাবদ্ধতা ও নগর বন্যা মোকাবিলায় প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

৭. গণপরিবহন ও চলাচল ব্যবস্থা: সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও সমন্বিত গণপরিবহন উন্নয়ন; ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভরতা কমিয়ে গণপরিবহনমুখী বিনিয়োগ বৃদ্ধি; পথচারী, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীবান্ধব সার্বজনীন চলাচল ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বহুমাধ্যমভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মেট্রোরেল, মনোরেল, লাইট র‍্যাপিড ট্রানজিট (এলআরটি), কমিউটার ট্রেনের পাশাপাশি বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ও উন্নত বাস-মিনিবাস সার্ভিসের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। জলপথ ও রেলপথ ব্যবহারের গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

৮. স্থানীয় সরকার ও নগর শাসন: সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন; নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিতকরণ; পরিকল্পনা ও বাজেট প্রক্রিয়ায় নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নগর শাসন প্রতিষ্ঠা।

৯. সামাজিক ন্যায্যতা ও অন্তর্ভুক্তি: নগর দরিদ্র, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা; হকার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের নীতিগত স্বীকৃতি; স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সেবায় বৈষম্য কমানো এবং নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণপরিসর নিশ্চিত করা। কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি ও সহজ ঋণ প্রদান, খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, সবার জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা,

১০. প্রমাণভিত্তিক ও পেশাদার পরিকল্পনা: নগর ও আঞ্চলিক উন্নয়নে পেশাদার পরিকল্পনাবিদদের সক্রিয় ভূমিকা; ডাটা, গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ; রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে বাস্তবায়নযোগ্য ও কার্যকর নগর এজেন্ডা প্রণয়ন।

সারাবাংলা/এমএইচ/এনজে
বিজ্ঞাপন

রাজধানীর ৯ স্থানে গণজমায়েত নিষিদ্ধ
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:২০

আরো

সম্পর্কিত খবর