ঢাকা: বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের (জানুয়ারি–জুন) সময়ের জন্য নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। এতে নীতি সুদহার বা পলিসি রেট ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
একইসঙ্গে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আটকে রাখার প্রবণতা কমাতে স্থায়ী আমানত সুবিধা হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে স্থায়ী ঋণ সুবিধা হার ১১.৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমাদের লক্ষ্য এখন শুধু মুদ্রাস্ফীতি কমানো নয়, বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা পুনর্গঠন করা।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, উচ্চ ও অসম মুদ্রাস্ফীতির প্রেক্ষাপটে এখনই নীতিগত হার কমানো হলে টাকার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির অবস্থান বজায় রেখেই তারল্য ব্যবস্থাপনায় সূক্ষ্ম সমন্বয় আনা হয়েছে, যাতে আন্তঃব্যাংক বাজার ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ধীরে ধীরে সক্রিয় হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক ব্যাংক বেসরকারি খাতে ঋণ না বাড়িয়ে কিংবা আন্তঃব্যাংক বাজারে অংশ না নিয়ে অতিরিক্ত তারল্য এসডিএফে রেখে নিশ্চিত মুনাফা অর্জন করছে। এতে ঋণপ্রবাহ স্থবির হয়ে পড়ছে। এসডিএফ হার কমানোর মাধ্যমে এই প্যাসিভ আচরণ নিরুৎসাহিত করে ব্যাংকগুলোকে আরও সক্রিয় তারল্য ব্যবস্থাপনায় আনাই বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিনিময় হার স্থিতিশীল ও বৈশ্বিক পণ্যমূল্য সংযত থাকায় আমদানিকৃত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সরবরাহ-পক্ষের সীমাবদ্ধতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এখনও লক্ষ্যমাত্রার (৭ শতাংশ) ওপরে রয়েছে।
এ ছাড়া আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, রমজান মাস এবং সম্ভাব্য নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কারণে স্বল্পমেয়াদে চাহিদা-চাপ বৃদ্ধির ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
কঠোর মুদ্রানীতি, সরকারি ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রার কারণে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক স্বীকার করেছে যে, বর্তমানে অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ সম্প্রসারণের বদলে ব্যালান্স শিট মেরামতে বেশি মনোযোগী।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ব্যাংকিং খাতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত খেলাপি ঋণ ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা উদ্বেগজনক হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এটি কঠোর সম্পদ শ্রেণিবিন্যাস ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের ফল— অর্থাৎ প্রকৃত চিত্রের প্রতিফলন।
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে ব্যাংকিং খাত সংস্কারের অগ্রগতিও তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫ ও ডিপোজিট সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর আওতায় দুর্বল ব্যাংক সমাধান, একীভূতকরণ এবং আমানতকারীর সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে। আমানত বীমা সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে, যা ৯৫ শতাংশ খুচরা আমানতকারীকে সুরক্ষা দেবে।
সার্বিকভাবে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক হার কমানোর ঝুঁকি না নিয়ে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে, তবে এসডিএফ হ্রাসের মাধ্যমে ঋণপ্রবাহে ধীরে ধীরে গতি আনার কৌশল নিয়েছে। এটি একদিকে মুদ্রাস্ফীতির লাগাম ধরে রাখবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্বাভাবিকতায় ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।