Tuesday 10 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

চুয়াডাঙ্গা-১ আসন
বিএনপির টার্গেট আসন পুনরুদ্ধার, জামায়াত চায় ইতিহাস গড়তে

রিফাত রহমান ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৩ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৪

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী শরীফুজ্জামান শরীফ ও জামায়াত মনোনীত মাসুদ পারভেজ রাসেল। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

চুয়াডাঙ্গা: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভারত সীমান্তবর্তী চুয়াডাঙ্গা জেলা। এই জেলার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনায় অবস্থিত দেশের বৃহত্তম চিনিকল কমপ্লেক্স ঐতিহ্যবাহী কেরু অ্যান্ড কোম্পানি। এই প্রতিষ্ঠানটি জেলার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জমে উঠেছে ঐতিহ্যবাহী এই চুয়াডাঙ্গার দুটি আসনের নির্বাচন। যদিও এরই মধ্যে নির্বাচনি প্রচার শেষ হয়েছে। এখন অপেক্ষা কেবল ভোটের। আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। আর এই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে এখন ব্যস্ত নির্বাচন কমিশন।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাজধানী চুয়াডাঙ্গায় সংসদীয় আসন দুটি। এর মধ্যে সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলা নিয়ে গঠিত চুয়াডাঙ্গা-১। আসনটি সদর উপজেলার ছয়টি ও আলমডাঙ্গা উপজেলার ১৫টিসহ মোট ২১টি ইউনিয়ন, চুয়াডাঙ্গা ও আলমডাঙ্গা পৌরসভা এবং দু’টি থানা নিয়ে এই আসন। এই আসনের ১৮০টি কেন্দ্রে ৫ লাখ ১১ হাজার ৬৫৬ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

দেশ স্বাধীনের পর থেকে ভারতবিরোধী মানসিকতার ভোটাররা ভারতের পক্ষে অবস্থান নেওয়া দলগুলোকে পারতপক্ষে ভোট দেয়নি। ফলে ১৯৭৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ভারত ঘেঁষা আওয়ামী লীগ কখনো এ আসন থেকে জিততে পারেনি। এই সময়ের মধ্যে ১৯৮৬ সালে একবার স্বতন্ত্র প্রার্থী (জাতীয় পার্টি) ও ১৯৮৮ সালে জাসদ (রব)-এর প্রার্থী নির্বাচিত হয়। এই আসনটিতে বিএনপি দীর্ঘদিন অপরাজিত ছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ এই আসনে প্রথম জয় পায়। ২০০৯ সালের পর বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আসনটি আওয়ামী লীগ ২০২৪ সাল পর্যন্ত ধরে রাখে। সঙ্গত কারণেই বিএনপি নেতাকর্মীদের আশা, আগামী নির্বাচনে তারা তাদের হারানো আসন ফিরে পাবে।

এই আসনটি একসময় বিএনপির ঘাঁটি ছিল। দলটিতে ছিল শৃঙ্খলা। এমনকি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকায় এক সময় এই আসনটি হয়ে উঠেছিল বিএনপির অপ্রতিরোধ্য দুর্গ। ৭৩ সালের পর থেকে ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আওয়ামী লীগ কখনো জিততে পারেনি। চুয়াডাঙ্গা জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালের ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী মিঞা মোহাম্মদ মুনসুর আলী, ১৯৯৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জয় পান বিএনপি প্রার্থী শামসুজ্জামান দুদু, ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির প্রার্থী দুদু জয়ী হন।

এর পর ২০০১ সালের অনুষ্ঠিত ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন চার দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী শহিদুল ইসলাম বিশ্বাস। ২০০৮ সালের পর বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির হাতছাড়া হয় আসনটি। এই সময়ে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। সেই হিসাবে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনটিকে বরাবরই বিএনপির আসন হিসাবে ভোটাররা হিসাব-নিকাশ করে আসছেন। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি নেতাকর্মীদের আশা, তারা ফিরিয়ে আনবেন তাদের হারানো আসনটি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন ভোটের মাঠের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাই মাঠে সক্রিয়। আওয়ামী (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শাসনামলের ১৭ বছর এখানে জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়ে জেলজুলুমের মুখোমুখি হয়। সে সময় উভয়দল একত্রে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাস্তবতায় ভোটের মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়দলের প্রার্থী।

চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তরুণ নেতা শরীফুজ্জামান শরীফ। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, তিনি নির্বাচিত হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দেবেন। আলমডাঙ্গা উপজেলায় একটি বড় হাসপাতাল করতে চান তিনি। এ জেলায় পরিপূর্ণ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে তার শক্ত অবস্থান থাকবে বলেও জানান শরীফ।

এই আসনে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য ও চুয়াডাঙ্গা জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ রাসেল। সাবেক এই ছাত্রনেতা এর আগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া, আলমডাঙ্গার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও একসময় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হওয়ারও নজির রয়েছে তার।

জামায়াতের এই প্রার্থী রাসেল গত ১৬ বছরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থেকে কারাবরণ করেন। আওয়ামী আমলেও তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে বারবার জয়লাভ করে জনপ্রিয়তার স্বাক্ষর রাখেন। এ সময় তিনি শুধু জামায়াতেরই নয়, বরং বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের নামে আওয়ামী লীগের করা শতশত গায়েবি মামলা পরিচালনা করে মজলুম নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সর্বমহলে প্রশংসিত ও পরিচিত এই তরুণ নেতা চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে ভোট যুদ্ধে সমীকরণ পালটে দিতে পারেন।

মাসুদ পারভেজ রাসেল সারাবাংলাকে জানান, তিনি নির্বাচিত হতে পারলে চুয়াডাঙ্গাকে একটি রোল মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তুলবেন। তিনি জেলার উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন, আলমডাঙ্গায় একটি ওভার ব্রিজ নির্মাণ, মা ও শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, কৃষকদের বিনা সুদে অর্থ প্রদান, এলাকার অবহেলিত মানুষের উন্নয়নে সার্বিক ব্যবস্থা নেবেন।

এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা জহুরুল ইসলাম আজিজিকে এখানে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হলেও মাঠে তার তেমন কোনো নির্বাচনি তৎপরতা চোখে পড়েনি। সাধারণ ভোটারদের মনে এই দলটির প্রার্থী কোনো প্রভাব ফেলতে পারেননি। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, এবারের নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে মূলত বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে। এদের একজন চাইবেন, নির্বাচনে জিতে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে; আরেকজন চাইবেন, জয়ী হয়ে নতুন বাংলাদেশে নতুন বন্দোবস্তের নেতৃত্ব দিতে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জয়ী হয়ে কে হাসবেন বিজয়ের হাসি সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা…।

বিজ্ঞাপন

আরো

রিফাত রহমান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর