ঢাকা: অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭-১৮ মাসে অনেক কাজ শুরু হয়েছে, যেগুলোর ফল সামনে দেখা যাবে- বলে দাবি করেছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ।
তিনি বলেন, কিছুই করা হয়নি, এমন বলা ঠিক নয়। সমালোচনা করার সময় পুরো চিত্রটা দেখতে হবে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অন্তর্বর্তী সময়ে অর্থনীতি পরিচালনা করা সহজ ছিল না। কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে। একই কারণে অনেক উদ্যোগ শুরু করা গেলেও সবকিছু শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবুও জনগণের স্বার্থে কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়েছে, সেটিই বড় অর্জন। চলমান উদ্যোগগুলো পরবর্তী সরকার ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নিলে ব্যাংক খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরবে।
আগামী সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, নতুন করে সব আবিষ্কার করার দরকার নেই। আমরা যা করেছি, সেটাকে কনসলিডেট করুন। ভালো জিনিসগুলো ধরে রাখুন। সবচেয়ে জরুরি হলো সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো।
তিনি বলেন, অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান। ব্যবসা ও শিল্প সচল না হলে কর্মসংস্থান আসবে না। কর্মসংস্থান না হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে না। আর মূল্যস্ফীতি শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যার সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় জড়িত।
ব্যাংক খাত সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, শুধু এককালীন সিদ্ধান্তে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। যদিও আমানত কিছুটা বেড়েছে, তবু পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। খেলাপি ঋণ, আস্থাহীনতা ও সীমিত ক্রেডিট সাপ্লাই অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেবল আইনে গভর্নরের মর্যাদা বাড়ালেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। অপারেশনাল সক্ষমতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরি।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চার বছর গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বড় কোনো সরকারি হস্তক্ষেপের মুখে পড়েননি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এনবিআর-কে কার্যকর করতে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হলেও নীতিগত সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যায়নি। পলিসি ডিভিশনগুলো যদি আরও আগে থেকে পুরোপুরি কাজ শুরু করতে পারতো, তাহলে ফলাফল আরও ভালো হতো। তবে কর নীতিমালার একটি গাইডলাইন রিপোর্ট রেখে যাচ্ছি, যা পরবর্তী সরকারের জন্য সহায়ক হবে।
পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতকেন্দ্রিক জটিলতা ও দীর্ঘদিনের সমস্যার কারণে সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতি হয়েছে। তবে ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ইক্যুইটি ও বন্ড মার্কেট উন্নয়ন অপরিহার্য। বিশ্বের সব দেশেই প্রাইভেট সেক্টরের জন্য শেয়ার ও বন্ড মার্কেট গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ব্যাংকের ওপর নির্ভর করে টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়।
অর্থপাচার প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কোন্ কো্ দেশে, কারা অর্থ পাচার করেছে, সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বলা কঠিন। আর বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের মতো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তবে বেসটা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী সরকার যদি সিরিয়াস হয়, তাহলে এসব তথ্যগুলো কাজে লাগাতে পারবে।
অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে নিজের কাজের মূল্যায়ন নিয়ে তিনি বলেন, আমি খুব প্র্যাগমেটিক মানুষ। আমাদের অনেক ইচ্ছা ছিল, অনেক কাজ শুরু করেছি, কিন্তু সব শেষ করে যেতে পারিনি। সে কারণে আমি নিজেকে ৭০ বা ৮০-এর বেশি দিতে রাজি নই।
নিজের জবাবদিহিতা প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, তিনি অনেক আগেই সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতার আশঙ্কাও দেখছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি।