চট্টগ্রাম ব্যুরো: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে কড়া নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে সতর্ক অবস্থানে আছেন। নগরী এবং জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি ও তল্লাশি চলছে।
চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় ১৬টি সংসদীয় আসন মিলে এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় ৪০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী, এপিবিএন, বিজিবি, আনসার, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ডের সদস্যরা আছেন। গত শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) থেকে তারা মাঠে কাজ করছে। তবে ভোটগ্রহণের দুইদিন আগে এসে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে কাজ করবেন বলে চট্টগ্রামের রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটির অবস্থান পুরোপুরি মহানগরীতে। ১০টি আসনের অবস্থান জেলায়। বাকি তিনটি আসন জেলা ও মহানগরীর কিছু অংশ মিলে আছে। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এবং আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জেলায় নিরাপত্তা প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ পরিবেশে ভোটগ্রহণের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে অলরেডি মাঠে নেমে গেছি। জেলায় আমাদের সাড়ে চার হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য মাঠে কাজ করছে। আমাদের মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, পেট্রল টিম, ডিবি ও সাদা পোশাকের পুলিশ আছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি সিস্টেমে কাজ হবে। বডি-ওর্ন ক্যামেরা থাকবে পুলিশ সদস্যদের কাছে। সিসি ক্যামেরাও আছে ভোটকেন্দ্রে।’
তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, কেন্দ্রের বাইরে শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটারদের নিরাপদে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া- এ তিনটি বিষয় নিশ্চিত করার জন্য আমরা কাজ করছি। আমাদের ফোর্সের মনোবল অটুট আছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া হবে না।’
পুলিশ কোনো ধরনের পক্ষপাতমূলক আচরণ করবে না জানিয়ে এসপি নাজির বলেন, ‘আমাদের সকল সদস্যকে কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, নিরপেক্ষ থাকতে হবে। বিন্দুমাত্র পক্ষপাতিত্বের কোনো সুযোগ নেই। আরেকটি বিষয়, এবার সকল বাহিনীর মধ্যে যে সমন্বয় তৈরি হয়েছে সেটা অভূতপূর্ব। আমরা অতীতে এরকম দেখিনি।’
মহানগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশীদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘মহানগরী ও জেলা মিলিয়ে পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী, বিজিবিসহ ৪০ হাজারের মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন আছে। এর মধ্যে মহানগরীতে আমাদের ৫ হাজার ২৬৫ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বিঘ্নে যাতে ভোটগ্রহণ হয় সেজন্য নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশের চেকপোস্টের কার্যক্রম চলছে। অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাসহ সমন্বিতভাবে টহল কার্যক্রমও চলছে।’
এদিকে চট্টগ্রামের নির্বাচনি এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং নির্বাচনি অপরাধসমূহ আমলে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ৩১ জন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া প্রার্থীদের আচরণবিধি মনিটারিংয়ে মাঠে আছেন ৪২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। সব মিলে চট্টগ্রামে ১৪২ জন ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন।’
এদিকে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ৪০ হাজার সদস্য চট্টগ্রামে মাঠে কাজ করছেন। জেলায় ১১৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন।
ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলার কোনো সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার আমরা নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাসদস্যরা বডি-ওর্ন ক্যামেরা নিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা বা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের স্ট্রাইকিং ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব প্রতিরোধের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা রোধে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া এক্সপার্টরাও আছেন। একটি অ্যাপের মাধ্যমে সন্দেহজনক লিংক রিয়েল না ফেক তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে।’
এদিকে নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। পরিপত্র জারি অনুযায়ী মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে (জেলায়) প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ২ জন পুলিশ (অস্ত্রসহ), ১ জন আনসার (অস্ত্রসহ), প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য ১ অস্ত্রসহ আনসার সদস্য, ১ অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার, সহকারী সেকশন কমান্ডার (অস্ত্রসহ), অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ও ভিডিপি (মহিলা ৪ জন, পুরুষ ৬ জন) মোট ১০ জন লাঠিসহ। গ্রাম পুলিশ ১ থেকে ২ জন লাঠিসহ। গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে পুলিশ ৩ জন অস্ত্রসহ, আনসার ১ জন, সেকশন কমান্ডার (অস্ত্রসহ), প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য ১ অস্ত্রসহ আনসার সদস্য, ১ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ও ভিডিপি (মহিলা ৪ জন, পুরুষ ৬ জন) মোট ১০ জন লাঠিসহ এবং গ্রাম পুলিশ ১ থেকে ২ জন লাঠিসহ। মেট্রোপালিটন এলাকার ভোট কেন্দ্রে পুলিশ ৩ জন অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ১জন অস্ত্রসহ, প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য ১ অস্ত্রসহ আনসার সদস্য, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ১জন অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ও ভিডিপি (মহিলা ৪ জন, পুরুষ ৬ জন) মোট ১০ জন লাঠিসহ। মেট্রোপালিটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ ভোট কেন্দ্র গুলোতে থাকবে পুলিশ ৪ জন অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার ১ জন (অস্ত্রসহ), প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তার জন্য ১ অস্ত্রসহ আনসার সদস্য, ১ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য অস্ত্রসহ, অঙ্গীভূত আনসার/সাধারণ আনসার ও ভিডিপি (মহিলা ৪ জন, পুরুষ ৬ জন) মোট ১০ জন লাঠিসহ দায়িত্ব পালন করবেন।