Monday 16 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই সনদ’

সারাবাংলা ডেস্ক
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২০ | আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:২২

জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই সনদ, যার ভিত্তিতে গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিয়েছে দেশের মানুষ। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আশা করব, এটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন হবে।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন। এটিই ছিল তার সরকারপ্রধান হিসেবে শেষ ভাষণ।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ছোট-বড়, ভালো-মন্দ অনেক কথা ভুলে গেলেও জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ভুলবে না। এই সনদ রচনা এবং গণভোটে পাস করানোর জন্য আমি সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, অধিকার রক্ষা প্রতিষ্ঠান যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে তাদের সবাইকে আজ অভিনন্দন জানাচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোট দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যখন একজন ভোটার গর্বভরে এই নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা সোশ্যাল মিডিয়ায় বলে তখন একজন নাগরিক হিসেবে আমি আনন্দ ধরে রাখতে পারি না। আমি আশা করি, এই প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যতে আরও অনেক বেশি প্রবাসীরা নিশ্চিন্তে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।’

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘ওই সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল—তার কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।’

তিনি জানান, এই সংস্কারগুলো নাগরিক অধিকারকে সংহত করেছে, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি যেন আর কখনো ফিরে না আসে সেটা নিশ্চিত করেছে।

ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। থানাগুলো ছিল পুলিশশূন্য, জনগণের মধ্যে আস্থার বদলে ভয় ও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ধাপে ধাপে আমরা সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছি। আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না, ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করে না, পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীর ভয়ে কাউকে ডিলিট বাটন চাপতে হয় না। জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে।’

তিনি উল্লেখ করেন, বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে যুগান্তকারী সংস্কার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সেপারেশন অব জুডিশিয়ারির জন্য মাজদার হোসেন মামলার রায় আমরা বাস্তবায়ন করে গেলাম।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে রায় সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ, বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ এবং অন্তর্বর্তী আপিলের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ যেন আর কখনো মানবাধিকারহীন রাষ্ট্রে পরিণত না হয়—সে লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে এবং কমিশন গঠন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন তার নারীরা নিরাপদ, সম্মানিত ও সমান অধিকারপ্রাপ্ত হন। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে, অর্থনীতিতে, শিক্ষায় ও নেতৃত্বে সমানভাবে অংশ নিতে পারেন। যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি নারীদের অগ্রযাত্রা ছাড়া তা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নারী ও শিশুর সুরক্ষায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করা হয়েছে। নতুন এসব আইনের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথ সুগম করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বৈরাচারের ১৬ বছরে এদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যে ভয়াবহ নিপীড়ন, মামলা–হামলা, গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন, তা আমাদের জাতির জন্য এক গভীর ও বেদনাদায়ক শিক্ষা। এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো জালেম মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত না হয়, শত শত আয়নাঘর সৃষ্টি না হয়, বিচারবহির্ভূত হত্যা ফিরে না আসে—সেজন্য কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক ও গভীর সংস্কার। এই উপলব্ধি থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার তার সংস্কার কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।’

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘বিচার একটা চলমান প্রক্রিয়া। একাধিক ট্রাইবুনাল বর্তমানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এরই মধ্যে একাধিক মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফ্যাসিবাদের সময়ে দেশে যে গুমের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল সেই ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারও শুরু হয়েছে। বেশকিছু মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখন শেষের পথে।’ আগামী দিনগুলোতেও বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

রাজবাড়ীতে কারেন্ট জালসহ জেলে আটক
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:০৭

আরো

সম্পর্কিত খবর