Wednesday 01 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

প্রবাসী আয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড: মার্চে এসেছে পৌনে ৪ বিলিয়ন ডলার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১ এপ্রিল ২০২৬ ২১:৩২

– ছবি : প্রতীকী

ঢাকা: চলতি বছরের মার্চ মাসে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন (৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার) ইতিহাসে এটিই এ যাবৎকালের একক মাসের হিসাবে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। আর ২০২৫ সালের মার্চের ৩ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ছিল এর আগের রেমিট্যান্সের রেকর্ড। মূলত মধ্যে প্রাচ্যের ইরান কেন্দ্রিক অস্থিরতার কারণে অনেক প্রবাসী তাদের অর্থ দেশে পাঠানোয় রেমিট্যান্সের একটি উলম্ফন সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার (১ এপ্রিল) বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, বিদায়ী মার্চে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৫ হাজার ডলার। যা তার আগের মাস ফেব্রুয়ারির চেয়ে প্রায় ৭৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বেশি এসেছে। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩০২ কোটি ডলার। যদিও গত বছরের মার্চে এসেছিল ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ডলার।

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত বছরের মার্চ মাসে। সে সময় প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছিলেন মোট ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার (৩.২৯ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল গত ডিসেম্বরে। ওই মাসে দেশে আসে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার (প্রায় ৩.২৩ বিলিয়ন)। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে গত জানুয়ারিতে, যার পরিমাণ ছিল ৩১৭ কোটি বা ৩.১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, মার্চ মাসে ঈদ থাকায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে এটা স্বাভাবিক একটি প্রবণতা। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে এখনো কাজের সুযোগ বজায় আছে এবং বেকারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়ও খুব বেশি না বাড়ায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতা মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। তবে অস্থিরতার কারণে অনেক জমানো অর্থ আগের চেয়ে বেশি দেশে পাঠিয়েছেন। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ খুব একটা কমবে না। তবে প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য পরেবর্তী ঈদের কমপক্ষে এক মাস অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে হুন্ডি কমে আসায় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বিগত তিন মাসে রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধিতে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এখন স্বাভাবিক পর্যায় মনে হলেও, এই ধারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিশেষ করে নতুন কর্মী বিদেশে যাওয়ার পথ এখনো সীমিত থাকায় ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য শেষ হওয়া মার্চ মাসে রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৬৪ কোটি ডলারের বেশি রেমিট্যান্স। বিশষায়ীত দুই ব্যঅংকের মধ্যে এক ব্যাংকের (কৃষি ব্যাংক) মাধ্যমে এসেছে ৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৬৪ কোটি ডলার। আর বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে এক কোটি ২০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়। তবে এ সময়ের ৭ ব্যাংকের মাধ্যমে কোন রেমিট্যান্স আসেনি। এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে- বিশেষায়িত রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক বা রাকাব, বেসরকারি খাতের আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ও পদ্মা ব্যাংক। এছাড়া বিদেশি খাতের ব্যাংক আলফালাহ, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার মাধ্যমে কোন রেমিট্যান্স আসেনি।

বিশ্বব্যাংকের (ঢাকা অফিস) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব এখনো সামষ্টিকভাবে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর তেমন একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেরেনি। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থান হারানোর মতো বড় কোনো সংকটের কথা এখনো জানা যায়নি। একইভাবে শ্রমিকদের মজুরি কমে যাওয়ারও স্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ এখনো তেল উৎপাদন ও রপ্তানির মাধ্যমে আয় করছে। ফলে সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয় খুব বেশি বাড়েনি। এ কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স পাঠানোর সক্ষমতাও এখনো কমে যায়নি। তবে ভবিষ্যতে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে খারাপ প্রভাব পড়তে পারে।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে মাসে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসা অনেকটা স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে এসেছে। রমজান ও ঈদের সময় এটি আরও বাড়তে পারে। তবে মার্চ মাসে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, তার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের প্রবণতা নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া ঠিক হবে না। কোরবানির ঈদের সময় আবারও সাময়িকভাবে রেমিট্যান্স বাড়তে পারে, তবে সেটিও নির্ভর করবে যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর। তবে নতুন কর্মী পাঠানোর পথ এখনো অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। আগে যেখানে মাসে ৭০ থেকে ৮০ হাজার কর্মী বিদেশে যাওয়া স্বাভাবিক ছিল, সেটি কমে গেলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে এখনো কাজের সুযোগ বজায় আছে এবং বেকারত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতর কারণে অনেক প্রবাসী জমানো টাকা আগের চেয়ে বেশি দেশে পাঠিয়েছেন। সেজন্য রেমিট্যান্স বেশি এসেছে। আর গত কতিনমাস ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ভালো। যা আগামি কুরবানীর ঈদ পর্যন্ত চলতে পারে। তাই রেমিট্যান্সের প্রকৃত অবস্থা শুধু মার্চ দিয়ে বিবিচেনা করা উচিত হবে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একের পর এক পদক্ষেপ নেয়। পাশাপাশি সরকার নীতিগত সহায়তা এবং প্রবাসীদের মধ্যে ইতিবাচক প্রচারণা চালায়। গত বছর সরকার বদলে হুন্ডি কারবারিদের দৌরাত্ম্যের উপর নিয়ন্ত্রণের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। এছাড়া ঈদ এবং যুদ্ধি পরিস্থিতি রেকর্ড রেমিট্যান্স সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।